রাজনীতির বাইরে থেকেও সমাজের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব: নাছির ইউ মাহমুদ
নাছির ইউ মাহমুদ
চেয়ারম্যান, কুঞ্জ গ্রুপ
একজন উদ্যোক্তার পরিচয় কেবল তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, ক্রীড়া কিংবা জনকল্যাণের ক্ষেত্রেও একজন সফল মানুষের চিন্তা ও ভূমিকা তাঁর অবস্থানকে আলাদা মাত্রা দেয়। নাছির ইউ মাহমুদ সেই অর্থে একটি বহুমাত্রিক পরিচয়ের নাম। দেশের আবাসন খাতের উদ্যোক্তা, কুঞ্জ ডেভেলপারস

লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সাবেক ক্রীড়াবিদ, উত্তরা ক্লাব ও ঢাকা বোট ক্লাবের সাবেক সভাপতি—বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও সামাজিক পরিসরে সক্রিয়। একই সঙ্গে তিনি লায়নিজমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছেন নিয়মিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দিলেও খুব বেশি দিন সেখানে থাকেননি। নিজের উদ্যোগে ব্যবসায়িক জগতে প্রবেশ করেন। আবাসন খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করেন। তাঁর জীবন ও কাজের পরতে পরতে রয়েছে ছাত্ররাজনীতি, ফুটবল, সংগঠন পরিচালনা, ক্লাব সংস্কৃতি, উদ্যোক্তা জীবন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অভিজ্ঞতা।
নাছির ইউ মাহমুদের বেড়ে ওঠার পেছনে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনার রশিদ ছিলেন একজন সাহসী ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ সুপার পদ থেকে অবসর নেওয়া এই কর্মকর্তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পটুয়াখালী কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। থানার মালখানা খুলে অস্ত্র সরবরাহের মতো সাহসী পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মা জেবুন্নেছা বেগম ছিলেন গৃহিণী।![]()
পিতার চাকরির কারণে ঘন ঘন স্থানান্তরের সম্ভাবনা থাকলেও সন্তানদের লেখাপড়ায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তাই নাছির ইউ মাহমুদ ও তাঁর ভাইবোনদের বরিশালে নানার তত্ত্বাবধানে রেখে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ১৯৭৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন নাছির ইউ মাহমুদ। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ফুটবল হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম প্রধান পরিচয়।
ক্লাস এইটে পড়ার সময়ই বরিশালের প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে খেলার সুযোগ পান তিনি। ১৯৭৫ সালে ঢাকার শান্তিনগর ক্লাবের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। পরের বছর ঐতিহ্যবাহী ওয়ারী ক্লাবে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত খেলেন। সেই সময়ের ফুটবল ছিল ভিন্ন ধরনের। মাঠের অবস্থা ছিল অনুন্নত, বলের মানও ছিল আজকের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। কিন্তু খেলোয়াড়দের আবেগ, আন্তরিকতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘাটতি ছিল না। ওয়ারীর সেই ‘জায়ান্ট কিলার’ দলের অংশ হিসেবে বড় বড় দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বগুণ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৮৩ সালে গুরুতর ইনজুরির পর নিয়মিত ফুটবল থেকে সরে আসেন তিনি।
১৯৭৭-৭৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তাল। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭৯ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথম বিভাগ ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর পরিচিতির কারণে মাহমুদুর রহমান মান্নার উৎসাহে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রার্থী হন। নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় পরিসরে প্রবেশ করেন।
পরে রাজনৈতিক জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। তৎকালীন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের আন্তরিকতা, বিনয় এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ওই সময় জাসদ ছাত্রলীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী একযোগে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দেন। নাছির ইউ মাহমুদও তাঁদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যুক্ত হন।
এরপর ১৯৮১-৮২ সালের নির্বাচনে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে হল সংসদের অধিকাংশ পদ বাসদ ছাত্রলীগের প্রার্থীরা জয়ী করলেও ছাত্রদলের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি জিএস নির্বাচিত হন। তাঁর ছাত্রজীবনের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততার বাস্তব শিক্ষা দেয়।
ছাত্রজীবনের আরেকটি অধ্যায় ছিল ফুটবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কোন হলে থাকবেন, সেটি নিয়েও ফুটবল তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল। তিনি প্রথমে ফজলুল হক হলে থাকার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের তৎকালীন প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তাঁকে এসএম হলে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। কারণ, হলের ফুটবল দলকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের অনুরোধে এসএম হলে ওঠেন তিনি।
সেই সময় আন্তঃহল ফুটবল প্রতিযোগিতায় এসএম হলের দলকে শক্তিশালী করতে তাঁর উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। নতুন জার্সি, বুট ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে তিনি প্রভোস্টের কাছে আবেদন করেন। প্রথমে অনাগ্রহ থাকলেও তাঁর দৃঢ়তার কারণে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে সূর্যসেন হলের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ম্যাচে ২-০ গোলের জয় পায় এসএম হল। প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের একাধিক তারকা ফুটবলার। নাছির ইউ মাহমুদের কাছে সেই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না; সেটি ছিল সংগঠন, আত্মবিশ্বাস ও দলগত শক্তির এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
খেলাধুলা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট। তাঁর মতে, ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা খুঁজে বের করার বিকল্প নেই। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সুযোগ দিয়ে দেশের ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ সম্ভব নয়। জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিভা অন্বেষণ এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি মনে করেন, খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞান কাজে লাগানো গেলে ক্রীড়া প্রশাসনের মানও বাড়বে।
ছাত্রজীবনের পর ব্যাংকিং পেশায় যোগ দিলেও দ্রুতই ব্যবসায়িক জীবনে প্রবেশ করেন নাছির ইউ মাহমুদ। আবাসন খাতকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কুঞ্জ ডেভেলপারস লিমিটেড ও মাহমুদ বিল্ডার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড। এই খাতের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা বাধা ও সম্ভাবনার চিত্র উঠে আসে।
তাঁর মতে, শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। দেশের আগামী ৫০ বা ১০০ বছরের জন্য একটি ধারাবাহিক জাতীয় ভিশন প্রয়োজন। শিল্পায়ন, আবাসন, অবকাঠামো, গ্যাস, পানি, যোগাযোগ ও নগরায়ণের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য শুধু জমি দিলেই হয় না; নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগ, পানি ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো—ঋণগ্রস্ত হওয়া আর ঋণখেলাপি হওয়া এক বিষয় নয়। ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক। কেউ যদি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন, তিনি ঋণগ্রস্ত হলেও খেলাপি নন। আবার অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বাজারের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে একজন উদ্যোক্তা সাময়িক সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই সব ব্যবসায়ীকে একই দৃষ্টিতে বিচার করা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। নিজের ব্যবসার উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর ১৯টি প্রকল্পের ফ্ল্যাট এখনো বিক্রি হয়নি। বাজারের বাস্তবতা বিবেচনা না করলে উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যবসার পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, যার ব্যবসা, শিল্প বা সম্পদ রয়েছে, তাঁর সমাজের প্রতি নৈতিক দায়ও রয়েছে। কুঞ্জ গ্রুপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আবাসন নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। তাঁর কাছে উদ্যোক্তার সাফল্যের প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন সেই উদ্যোগ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব অবদান রাখে।
নাছির ইউ মাহমুদের দীর্ঘ সামাজিক জীবনের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ক্লাব সংস্কৃতি। উত্তরা ক্লাবের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ঢাকা বোট ক্লাব প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে বোট ক্লাবের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হন। তাঁর নেতৃত্বে ক্লাবের অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ক্লাব সম্পর্কে তাঁর ধারণা প্রচলিত বিলাসিতার ধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা। তাঁর মতে, একটি ভালো ক্লাবের ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা, নিয়ম-নীতি, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতি। সেখানে কেউ যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। পোশাকবিধি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা—সবকিছুতেই ক্লাবের নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে। এ কারণেই তিনি ক্লাবকে কেবল বিনোদনের স্থান না বলে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন।
তাঁর মতে, বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত ব্যস্ত। পরিবারকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সেই জায়গায় ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন, খেলাধুলা, ব্যায়াম, সুইমিং, উৎসব ও মিলনমেলা একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে। বিভিন্ন পেশার মানুষ—বিচারক, আইনজীবী, প্রশাসক, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, ব্যাংকার ও সাংবাদিক—একই জায়গায় মিলিত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়।
ঢাকা বোট ক্লাব নিয়ে তাঁর পরিকল্পনাও ছিল দীর্ঘমেয়াদি। চট্টগ্রামে নৌবাহিনী পরিচালিত একটি বোট ক্লাব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকার তুরাগ নদীর তীরে বোট ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে নিজস্ব জমি, লিজ নেওয়া জমি, জেটি, গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, পর্যটন জাহাজ ও আবাসিক কক্ষসহ ক্লাবটির একটি বিস্তৃত অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এটিকে নাগরিক বিনোদন ও পর্যটনের একটি আধুনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও ক্লাবকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শীতার্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যাদুর্গতদের খাদ্য, ওষুধ ও পুনর্বাসন সহায়তা এবং ক্লাবের কর্মীদের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০০ কর্মীর জন্য আর্থিক সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি ও চিকিৎসা সহযোগিতার মতো কার্যক্রমও রয়েছে। তাঁর কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা কেবল করপোরেট নীতির একটি শব্দ নয়; বাস্তব প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব।
বর্তমান সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে তিনি মাদককে সবচেয়ে ভয়াবহ মনে করেন। তাঁর মতে, মাদকের বিস্তার তরুণ প্রজন্মকে বিপজ্জনকভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ক্লাব—সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। কোনো পরিবারে মাদকাসক্তির সমস্যা দেখা দিলে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাশে দাঁড়ানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান এখন তুলনামূলকভাবে সংযত। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের জন্য কাজ করতে হলে সব সময় সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সেবার মানসিকতা থাকলে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা কিংবা সামাজিক সংগঠনের কর্মী হিসেবেও সমাজে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব।
রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন। তাঁর মতে, জনগণ যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাদের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, প্রশাসনের সর্বস্তরেও আইন ও বিধি অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের শাসন দুর্বল হলে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থকে ছাপিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন। একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটতে পারে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, নতুন চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান ও উদ্ভাবনী শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করার জন্য নেতৃত্বে সুযোগ সৃষ্টি জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগ আরও মানবিক ও সময়নির্ভর হওয়া দরকার। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন, অনেক চিকিৎসক রোগীর কথা দীর্ঘ সময় শুনে রোগের ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে হয়েছে, রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের আন্তরিক যোগাযোগ চিকিৎসার মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব মিলিয়ে নাছির ইউ মাহমুদের জীবনকথা আসলে একাধিক পরিচয়ের সমন্বিত গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সাহসী পিতার পরিবারে বেড়ে ওঠা এক তরুণ ফুটবলার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা, সেখান থেকে উদ্যোক্তা, আবাসন ব্যবসায়ী, ক্লাব সংগঠক এবং সমাজসেবী—প্রতিটি পর্যায় তাঁর ব্যক্তিত্বে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা যোগ করেছে। রাজনীতির সক্রিয় ময়দান থেকে সরে এসে এখন তিনি ব্যবসা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নাগরিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নিজের ভূমিকা তৈরি করতে চান।
তাঁর কথায় বারবার যে বিষয়টি ফিরে আসে, তা হলো—দেশের উন্নয়ন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, আবার শুধু ব্যবসায়ীদের দায়িত্বও নয়। রাষ্ট্র, ব্যবসা, শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সমাজ—সব ক্ষেত্রকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একজন উদ্যোক্তার সম্পদ যেমন তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতীক, তেমনি সেই সম্পদ দিয়ে মানুষের জন্য কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্ব। নাছির ইউ মাহমুদের জীবন ও চিন্তার সবচেয়ে বড় বার্তাটি তাই সম্ভবত এটাই—রাজনীতির বাইরে থেকেও মানুষের জন্য কাজ করা যায়, সমাজে প্রভাব রাখা যায় এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশ হওয়া যায়। তবে সে জন্য প্রয়োজন সততা, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
রাজু আলীম
কবি. সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
![]()