ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে ভয়াবহ মানসিক সংকটের মুখে পড়েছেন মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের প্রায় ৫ হাজার নাবিক। টানা প্রায় আট মাসের বেশি সময় সমুদ্রে মোতায়েন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা তাঁদের অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক নাবিক তাঁর স্ত্রীকে বার্তা দিয়ে লিখেছেন, তিনি আশা করছেন ‘আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে’। সম্প্রতি সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে এমন তথ্য তুলে ধরেন নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা। সভায় প্রায় ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান ও যুদ্ধের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক নাবিকের মনোবল ভেঙে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাও তৈরি হয়েছে। এমনকি অন্তত একজন নাবিককে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে বলে নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
নাবিকদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন। জাহাজে খাবার ও পানির সংকট, টানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং বিশ্রামের সীমিত সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তাঁদের সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো—কবে দেশে ফিরবেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখও তাঁদের জানানো হচ্ছে না।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছাড়ে। পরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে কোনো ধরনের নিয়মিত বন্দরবিরতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করছে রণতরিটি। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৪০ দিন যুদ্ধাভিযানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সব মিলিয়ে টানা প্রায় ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটানোর ধকল সামলাচ্ছেন নাবিকেরা।
সাধারণত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নাবিকদের মানসিক চাপ ও একঘেয়েমি কমাতে নিয়মিত বন্দরবিরতি দেওয়া হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো বন্দরে নোঙর করে। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ব্যাহত হয়েছে।
এক নাবিকের ভাষায়, পুরো মোতায়েনজুড়ে তাঁরা কোনো বিরতি ছাড়াই কাজ করে গেছেন। এখন তাঁদের আর কোনো বিশেষ প্রত্যাশা নেই। বন্দরে যাত্রাবিরতির চেয়েও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট তারিখ জানা।
পরিবারগুলোর অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি উঠে এসেছে আত্মহত্যার ঝুঁকির প্রসঙ্গে। গত জুলাইয়ে এক অভিভাবক সামরিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া চিঠিতে জানান, তাঁর ছেলে ও তাঁর সহকর্মীরা মানসিক স্বস্তির জন্য জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছেন। আরেক নাবিক জানান, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।
তবে নির্দিষ্ট ওই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। বাহিনী জানিয়েছে, নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করা হচ্ছে বলে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শুধু মানসিক চাপ নয়, দীর্ঘ মোতায়েনের সময় জাহাজটিতে খাদ্য ও পানির সংকটও দেখা দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। একটানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় কাপড় ধোয়ার সুযোগ না পাওয়ার মতো সমস্যার কথাও তাঁরা জানিয়েছেন। তবে তাঁদের মতে, বর্তমানে এসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং ডাক যোগাযোগও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সময় নতুন করে রসদ নেওয়ার সুযোগ পায় আব্রাহাম লিংকন। দীর্ঘ কয়েক মাস পর তখন নাবিকেরা তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পান। তবে অনেক নাবিককে তীরে নামার সুযোগ দেওয়া হয়নি; যাঁরা নেমেছিলেন, তাঁদেরও বন্দরের একটি সুরক্ষিত এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাঁদের প্রিয়জনেরা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছেন। একজন নাবিকের স্ত্রী বলেছেন, তিনি নিজের চোখের সামনে স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছেন এবং তাঁর মনে হচ্ছে, তাঁরা যেন সব আশা হারিয়ে ফেলছেন।
নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংক্ষুব্ধ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহব্যবস্থা সামরিক সংঘাতের কারণে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বাহিনীর দাবি, বর্তমানে জাহাজে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে নাবিকদের দেশে ফেরার সময় নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। সামরিক নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দিতে রাজি হননি বলে নাবিকদের স্ত্রীরা জানিয়েছেন। এ অনিশ্চয়তাই তাঁদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সামরিক জীবনে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন, যুদ্ধের সরাসরি চাপ এবং ফেরার সময় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা।
২০২৫ সালে ‘মিলিটারি মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেখা যায়, মোতায়েনকালে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার নাবিকদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার অন্যতম প্রধান কারণ। ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবকেও বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যানও বলেছেন, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করে। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার ক্ষেত্রে একপর্যায়ে ইতিবাচক থাকার চেষ্টা থেমে যায় এবং সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি শুরু হতে পারে।
আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের সংকট তাই শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের ভেতরের সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের মানবিক মূল্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি হাজারো নাবিকের মানসিক সুস্থতা, বিশ্রাম, পরিবারে যোগাযোগ এবং নিরাপদে দেশে ফেরার নিশ্চয়তা এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্নটি রয়ে গেছে—যে নাবিকেরা দেশের হয়ে যুদ্ধ করছেন, তাঁদের কাছে যদি ঘরে ফেরার তারিখটিও অনিশ্চিত থাকে, তাহলে আর কতদিন ধরে তাঁরা এই মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে পারবেন?