সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আগুনে নিহতদের মরদেহ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়।
এ ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। সোমবার দেওয়া শোকবার্তায় তাঁরা নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকের সময়ে সরকার নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে কাজ করছেন তাঁরা।
দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুর্ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, মরদেহ হস্তান্তর এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।
রোববার রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় অবস্থিত ওই সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার ভেতরে বেশ কয়েকজন শ্রমিক ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তাঁরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ভেতর থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সৌদি ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায় বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁদের কয়েকজনের পরিচয়ও পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন—কালিকাপুর ইউনিয়নের কলি (৩০), লুৎফর (৩২), জান্ডার, রুবেল, বিশা এলাকার সাগর ও মজিদুল, দুবাই এলাকার শুভ ও সুমন, পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল এবং উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ শেখ।
তবে এই পরিচয়গুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত হবে। এ কারণে স্বজনদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে থাকা নিহতদের সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও দূতাবাস কাজ করছে। মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ তাঁদের শোকবার্তায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তাঁরা স্বজন হারানো পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
একসঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানির ঘটনায় সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যেও শোক নেমে এসেছে। বিশেষ করে নওগাঁর ১৩ জনের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিদেশে কর্মরত স্বজনদের মাধ্যমে অনেক পরিবার প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার খবর জানতে পারে। তবে মরদেহ শনাক্ত ও সরকারি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। দেশটির বিভিন্ন শিল্প, নির্মাণ, সেবা ও অন্যান্য খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক কাজ করছেন। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সৌদি আরবে যান। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
এ অবস্থায় কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
রিয়াদের সর্বশেষ এ দুর্ঘটনার কারণ কী ছিল, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে আগুন লাগার কারণ এবং কারখানাটিতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা উঠে আসতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ দূতাবাস দুর্ঘটনার পর থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, মরদেহ হস্তান্তর, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করা এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় দূতাবাস সহযোগিতা করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর সরকারের নজর রয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ দেশে ফেরত আনার বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিদেশের মাটিতে একসঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানি আবারও প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে বড় অপেক্ষা নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরে আসা।