ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ। তৃতীয় দিন শেষে স্বাগতিকেরা দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান তুলেছে। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৪২৬ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া এখনো পিছিয়ে ৬৭ রানে। ফলে চতুর্থ দিনেই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। কিন্তু ডারউইনে সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। তৃতীয় দিনের শেষ সেশনে বাংলাদেশের বোলাররা যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়েছেন, তাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল ৪২৬ রানে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টে করা ৪২৭ রান এখনো শীর্ষে। তবে ডারউইনে শুধু রানসংখ্যাই নয়, বাংলাদেশের ইনিংসের শেষ দিকের ব্যাটিংই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
মুশফিকুর রহিম আউট হওয়ার সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬ উইকেটে ৩০৮। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে লেজের ব্যাটসম্যানরা অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের দীর্ঘ সময় ব্যস্ত রাখেন। মিরাজ করেন ৬৫ রান। তাঁর সঙ্গে হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেনের কার্যকর ব্যাটিং বাংলাদেশকে ৪২৬ রানের সংগ্রহ এনে দেয়।
বাংলাদেশের শেষ চার উইকেট থেকে আসে গুরুত্বপূর্ণ ১১৮ রান। এই রানই শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ার বোলার জশ হ্যাজলউড ৬ উইকেট নিয়ে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করলেও দলের পরিস্থিতির কারণে সেই অর্জনও খুব একটা স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।
বাংলাদেশের ২০৬ রানের লিড পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০৬ বা তার বেশি রানে পিছিয়ে থেকেও জয়ের নজির নেই অস্ট্রেলিয়ার। ডারউইনে জিততে হলে তাই নিজেদের ইতিহাসের একটি বড় রেকর্ড বদলাতে হবে তাদের।
তৃতীয় দিন শেষ বিকেলে সেই কাজ আরও কঠিন করে তুলেছেন বাংলাদেশের বোলাররা। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসেও শুরুটা করেছেন দুর্দান্তভাবে। দ্বিতীয় ওভারে জেক ওয়েদারাল্ডকে বোল্ড করার পর ১১তম ওভারে সাজঘরে ফেরান ট্রাভিস হেডকে। হাসানের শরীরের কাছাকাছি থাকা বল কাট করতে গিয়ে স্টাম্পে টেনে আনেন হেড।
৩৭ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করেন মারনাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথ। তৃতীয় উইকেটে দুজন গড়েন ৩৬ রানের জুটি। কিন্তু তাইজুল ইসলাম সেই জুটি ভেঙে দেন। ৫৯ বলে ৩১ রান করা লাবুশেনকে বোল্ড করেন তিনি।
এরপর স্মিথও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৪৪ রান করে মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে চাপ আরও বেড়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য অবশ্য কিছুটা স্বস্তির ঘটনাও ঘটেছে। ক্যামেরন গ্রিনকে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেও তা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। তাসকিন আহমেদের একটি বল গ্রিনের স্টাম্পে আঘাত করলেও বেলস পড়েনি। বলটি স্টাম্পে লেগে সীমানার বাইরে চলে যায়। সেই ভাগ্য নিয়েই দিন শেষ করেছে অস্ট্রেলিয়া।
তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ক্রিজে আছেন ক্যামেরন গ্রিন ও তাঁর সঙ্গী। তাদের সামনে প্রথম কাজ হলো বাংলাদেশের লিড মুছে ফেলা। এরপর লক্ষ্য হবে এমন একটি স্কোর দাঁড় করানো, যাতে বাংলাদেশকে শেষ ইনিংসে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়।
তবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি যথেষ্ট শক্ত। প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছেন বোলাররা। হাসান মাহমুদ নতুন বল হাতে দুর্দান্ত ছিলেন, তাইজুল ইসলাম ও মিরাজও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আঘাত করেছেন। তাসকিন আহমেদের গতিও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের লেজের ব্যাটিংও ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গল্প। মিরাজের সঙ্গে হাসান মাহমুদের ৪৬ রানের জুটি, মিরাজ-তাইজুলের ১৮ এবং শেষ দিকে তাসকিন-ইবাদতের ছোট জুটিগুলো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি রান দিতে বাধ্য করেছে। ইবাদত হোসেনের ছক্কাটিও বাংলাদেশের ইনিংসের শেষ অংশকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার পেস ও বাউন্সের সামনে বাংলাদেশের নিচের সারির ব্যাটসম্যানদের এমন দৃঢ়তা ছিল ম্যাচের অন্যতম চমক। ৯২ বল খেলে হাসান মাহমুদের ১৪ রান যেমন অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে, তেমনি তাইজুল ও তাসকিনের কার্যকর ব্যাটিং বাংলাদেশের লিড বাড়িয়েছে।
এখন সব হিসাব অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসকে ঘিরে। তারা যত বেশি সময় ব্যাট করবে, বাংলাদেশের জয় তত কঠিন হবে। আর দ্রুত উইকেট হারালে ডারউইনের টেস্ট চলে আসবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে।
তৃতীয় দিন শেষে সমীকরণ তাই পরিষ্কার—অস্ট্রেলিয়ার সামনে টিকে থাকার লড়াই, বাংলাদেশের সামনে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। ঘরের মাঠে বড় ঘাটতি পুষিয়ে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফিরতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ডারউইনের আকাশে আপাতত জয়ের সম্ভাবনার মেঘ বাংলাদেশের দিকেই বেশি ঘন হয়ে এসেছে।