চীনা পণ্য তৃতীয় দেশের পথ ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করে শুল্ক এড়াচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটন। এ ঘটনায় কানাডা, মেক্সিকো, জাপানসহ ৪০টির বেশি দেশকে চীনা পণ্য স্থানান্তরের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
হোয়াইট হাউজের বাণিজ্য ও উৎপাদন নীতি দপ্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদনের নাম ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে না পাঠিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর প্রবণতা শুল্ক ফাঁকির বড় সুযোগ তৈরি করছে। ওয়াশিংটনের হিসাবে, এভাবে প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলারের পণ্য শুল্কের আওতা এড়িয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের ভিত্তিতে সম্ভাব্য পণ্যের পরিমাণ ৪ হাজার কোটি থেকে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ বলতে সাধারণত এমন বাণিজ্যপথকে বোঝানো হয়, যেখানে একটি দেশের পণ্য সরাসরি গন্তব্যে না গিয়ে অন্য একটি দেশে নেওয়া হয়। সেখানে পণ্যের মোড়ক বদল, সামান্য সংযোজন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা কাগজপত্রে পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তিস্থল ভিন্ন হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীনা পণ্যকে এভাবে তৃতীয় দেশের পণ্য হিসেবে দেখিয়ে মার্কিন বাজারে তুলনামূলক কম শুল্কে প্রবেশ করানো হচ্ছে।![]()
হোয়াইট হাউজের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেছেন, ২০১৮ সালে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপের পর থেকেই এ ধরনের প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের শুল্কহারে বড় পার্থক্য তৈরি হওয়ায় তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ওয়াশিংটনের প্রতিবেদনে শুধু চীন নয়, উচ্চ শুল্কের মুখে পড়া অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। নাভারো বিশেষ করে ভারত ও ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর শুল্ক বাড়ালে সেই দেশও কম শুল্কের তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর পথ বেছে নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ফের চাপের মুখে পড়েছে। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থের সরবরাহ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনায় তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য স্থানান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কাস্টমস ও সীমান্ত সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। পণ্যের গতিপথ, উৎপত্তি, শ্রেণিবিন্যাস এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করাই এর লক্ষ্য।
মার্কিন প্রশাসনের হিসাবে, ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির কারণে বছরে প্রায় ১৯ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাতে পারে দেশটি। তবে এই হিসাব নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন অনুমান রয়েছে।
ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ শুধু চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেই প্রভাব ফেলবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গেও নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিবেদনে যেসব দেশের কথা বলা হয়েছে, তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে শুল্ক ফাঁকি বন্ধের নামে তৃতীয় দেশের বাণিজ্যপথে কড়াকড়ি বাড়ানো হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে।