নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ববাজারে ফসফেট সারের সংকট, সালফারের ঘাটতি, সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে নন-ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের কাছে বেসরকারি সার আমদানিকারকদের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)। দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধে দেরি হওয়ায় এ পাওনার বিপরীতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সুদ জমেছে বলেও দাবি সংগঠনটির।
এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি আমদানিকারকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি সার আমদানি ও ভর্তুকি ব্যবস্থার কয়েকটি নীতিগত ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিএফএ। সংগঠনটির আশঙ্কা, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নন-ইউরিয়া সার আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায়।
কৃষি মন্ত্রীর কাছে গত ৯ আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে বিএফএ চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন। চিঠিতে বলা হয়, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে সরকারি ও বেসরকারি—দুই পর্যায়েই সার আমদানির ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এ সরবরাহব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে।
বিএফএ বলছে, বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি, সালফারের সংকট এবং চীনের সার রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে ফসফেট সারের সরবরাহ কমেছে। একই সঙ্গে ভারতও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী সার সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের বেসরকারি আমদানিকারকদের বড় অঙ্কের অর্থ সরকারের কাছে আটকে আছে। বিএফএ’র হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে প্রায় এক বছর পর বিল পরিশোধের কারণে আমদানিকারকদের আর্থিক ব্যয়ও বেড়েছে। এতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সুদ জমেছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিএফএ’র অন্যতম দাবি, সার সরবরাহের বিপরীতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানিকারকদের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। কোনো কারণে বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে সেই সময়ের জন্য সুদ দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটি সরকারি সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষেত্রে যে ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়, বেসরকারি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে।
বিএফএ আরও বলেছে, সার আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার সময়ের বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও পরিশোধের সময় বিনিময় হারে পরিবর্তন ঘটে। এতে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে পরিশোধের দিন সোনালী ব্যাংকের বিসি সেলিং রেট অনুযায়ী সার সরবরাহের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
কর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন চেয়েছে বিএফএ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আরোপ করা ১ শতাংশ টার্নওভার কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, সরকার নির্ধারিত ৩ শতাংশ লভ্যাংশের ওপর এ ধরনের কর আরোপ হলে আমদানিকারকদের প্রকৃত মুনাফা আরও কমে যায়।
এ কারণে টার্নওভার কর প্রত্যাহার অথবা বেসরকারি আমদানিকারকদের জন্য নির্ধারিত লভ্যাংশ ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে বিএফএ।
পরিবহন ব্যয় নিয়েও সরকারের কাছে পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সার পরিবহনের স্থানীয় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। এ কারণে বর্তমানে নির্ধারিত প্রতি টন ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থানীয় পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা করার দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আয়কর বিধিমালার বিভিন্ন ধারার আওতায় আরোপিত উৎসে কর, ডেফার্ড পেমেন্টের সুদ, এলসি কনফারমেশন ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারেরও অনুরোধ জানিয়েছে বিএফএ।
সংগঠনটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর একসঙ্গে একাধিক ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যমান কর ও ভর্তুকি কাঠামো বহাল থাকলে ব্যবসায়িকভাবে সার আমদানি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিএফএ দ্রুত একটি সভা আহ্বান করে এসব নীতিগত জটিলতা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নন-ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব দ্রুত চূড়ান্ত করার অনুরোধ করেছে সংগঠনটি।
সার দেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। আমদানিনির্ভর নন-ইউরিয়া সারের সরবরাহে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে আমদানিকারকদের অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা এবং নতুন আমদানি নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিএফএ সতর্ক করে বলেছে, সরকারের সঙ্গে বেসরকারি আমদানিকারকদের পাওনা ও নীতিগত বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে আগামী অর্থবছরে আমদানিকারকদের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। এতে একদিকে সার আমদানির সক্ষমতা কমবে, অন্যদিকে কৃষি মৌসুমে প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।