দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি টানলেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঠিক এক দিন আগে দলীয় নেতাকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন তিনি। বুধবার (১৯ আগস্ট) দেওয়া ওই বার্তায় শেষবারের মতো ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ’ স্লোগান লিখে দলীয় সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার কথা জানান মির্জা ফখরুল।
নিজের বিদায়ী বার্তায় মির্জা ফখরুল লেখেন, প্রিয় নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে তাঁর সর্বশেষ বিদায় নেওয়ার সময় এসে গেছে। শেষবারের মতো ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ’ বলে তিনি নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। বার্তার শেষে তিনি নিজেকে ‘আপনাদের বিশ্বস্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর’ হিসেবে উল্লেখ করেন।![]()
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর এমন আবেগঘন বিদায়ী বার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ সময় বিএনপির নেতৃত্বে থেকে দলটির কঠিন ও প্রতিকূল সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুলের এই বিদায়কে দলের নেতাকর্মীরাও আবেগের সঙ্গে দেখছেন। একই দিনে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি কার্যত তাঁর দীর্ঘ দলীয় দায়িত্বের শেষ দিনটি পার করেন।
সকালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে যোগ দেন তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এই বৈঠকই হয়ে ওঠে তাঁর জন্য বিদায়ী এক আবেগঘন মুহূর্ত।
বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতি এবং বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদেন। এ সময় উপস্থিত অনেক সংসদ সদস্যও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সহকর্মীদের কাছে দোয়া চান এবং আগামী দিনের জন্য তাঁদের শুভকামনা কামনা করেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ আলো জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মির্জা ফখরুলের আবেগঘন বক্তব্যের সময় উপস্থিত সবার মধ্যেই আবেগের সৃষ্টি হয়। তাঁর চোখে পানি দেখে অন্যরাও নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হিসেবে মির্জা ফখরুলের বিদায় একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার অনুভূতি তৈরি করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপিতে যোগদানের পর থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দলীয় সংকট, রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা-হামলা, নির্বাচন ও ক্ষমতার বাইরে থাকার দীর্ঘ সময়—সব মিলিয়ে বিএনপির একটি কঠিন সময়ের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।![]()
মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মির্জা ফখরুলকে শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বই পালন করতে হয়নি; একই সঙ্গে তাঁকে দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে দলের বক্তব্য স্পষ্ট করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিদায়ী বক্তব্যে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নানা স্মৃতির কথাও স্মরণ করেন মির্জা ফখরুল। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে তাঁর কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে সবার কাছে ক্ষমা চান তিনি। সহকর্মীদের উদ্দেশে তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা বৈঠকের আবেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, দল তাঁকে যে মর্যাদা, দায়িত্ব ও আস্থা দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তিনি তার সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবেন না বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরও দেশ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অটুট থাকবে—তাঁর বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে আসে।
দলীয় সহকর্মীদের ছেড়ে বঙ্গভবনে যাওয়ার পর তাঁদের অভাব অনুভব করবেন বলেও জানান মির্জা ফখরুল। দীর্ঘদিন যাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি যে তাঁর জন্য সহজ নয়, তাঁর বক্তব্যে সেটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী ঘোষণা করে। দলের মহাসচিব পদে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই তাঁর দলীয় দায়িত্ব ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে সাংবিধানিকভাবেই তাঁকে দলীয় রাজনীতি থেকে পৃথক অবস্থানে যেতে হবে। ফলে বুধবারের বিদায়ী বার্তাকে শুধু আনুষ্ঠানিক বিদায় নয়, তাঁর দীর্ঘ দলীয় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তির প্রতীক হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। জাতীয় সংসদ ভবনের নির্ধারিত কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।![]()
সংসদে বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তির সমীকরণে মির্জা ফখরুল অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তাঁর পক্ষে ২৪৭ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে অলি আহমদের পক্ষে রয়েছে ৯০ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই এখন মূল আলোচনা মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য বঙ্গভবন যাত্রা। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি থেকে সরে দেশের সাংবিধানিক সর্বোচ্চ পদগুলোর একটিতে বসতে যাচ্ছেন তিনি—এমন সম্ভাবনার মধ্যেই শেষবারের মতো দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী বার্তা বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের পথচলা ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। একদিকে তাঁকে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়েছে। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচন ঘিরে টানাপোড়েন, দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও মামলা, আন্দোলনের নানা পর্যায়—এসবের মধ্যেই তিনি বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল গণতন্ত্র, নির্বাচন, জনগণের অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা বিএনপির জন্য তিনি ছিলেন দৃশ্যমান ও পরিচিত মুখ। দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের অনুপস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক সংকটের বিভিন্ন সময়ে মহাসচিব হিসেবে তাঁকেই সামনে থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।![]()
এই দীর্ঘ পথচলার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের সামনে খুলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অধ্যায়। দলীয় রাজনীতির সরাসরি নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে তাঁকে সাংবিধানিক দায়িত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সর্বজনীন প্রতিনিধিত্ব করা। ফলে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে যে রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন, রাষ্ট্রপতি হলে সেই পরিচয়কে পেছনে রেখেই তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এ কারণেই বুধবারের বিদায়ী মুহূর্তটি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধাদের ছেড়ে যাওয়ার আবেগ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নতুন দায়িত্ব গ্রহণের প্রত্যাশা—দুই বিপরীত অনুভূতি একই দিনে এসে মিলেছে তাঁর জীবনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংক্ষিপ্ত বিদায়ী বার্তাতেও সেই আবেগের প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ’—বিএনপির এই পরিচিত স্লোগানটি শেষবারের মতো লিখে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। আর নিজেকে ‘আপনাদের বিশ্বস্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলীয় রাজনীতির আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শেষ হলেও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর আবেগ অটুট থাকবে।
এখন অপেক্ষা শুধু ভোটের ফলের। সংসদ সদস্যদের ভোটে মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হলে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য হবে বঙ্গভবন। আর সেই যাত্রার ঠিক আগের দিন দলীয় সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নেওয়া আবেগঘন বিদায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য হয়ে থাকল।![]()