প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দলের অনেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে নিজ নিজ এলাকায় সংগঠনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। দল ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় এবং সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বুধবার সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলীয় এমপিদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক বিএনপির সংসদ সদস্য গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভোট দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি দলের সব পর্যায়ে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এমপিদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি হলে তা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি অপরিহার্য—এই বিষয়টি দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের সবাইকে মনে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এ অবস্থানে আসতে যাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মির্জা ফখরুল দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দলের দুঃসময়ে তিনি সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কখনো হাল ছাড়েননি। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলের সংকটের সময়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁকে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
বৈঠকে বিএনপির বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বক্তব্য দেন। সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতা হিসেবে দেওয়া এটিই তাঁর শেষ বক্তব্য। বক্তব্যের একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে একাধিকবার কেঁদে ফেলেন তিনি। পরে উপস্থিত সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের কাছে দোয়া চান বিএনপির এই প্রবীণ নেতা।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। ফলে এই নির্বাচন দলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে এখন থেকেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে হবে।
গত সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সে সময় দলের অনেক নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একই ধরনের পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্য বা দলীয় নেতা যেন দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেন, তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য, যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, শুধু দলীয় পরিচয় নয়, স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের প্রার্থী করতে হবে। যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে দলীয়ভাবে তাঁর বিজয় নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দলের সাংগঠনিক শক্তি আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্কই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই সম্পর্ক দুর্বল হলে সাংগঠনিকভাবে তার প্রভাব পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি দুপুর ২টায় শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলে। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। এরপর বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান ও এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।![]()