জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনায়িকা ও অভিনেত্রী তমা মির্জা সম্প্রতি এ বি ব্যাংকে সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) পদে যোগ দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও ট্রল। সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্নটি হলো—ব্যাংকিং খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে কীভাবে একজন অভিনেত্রী সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ পান?
তবে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এই নিয়োগকে কেবল প্রচলিত ব্যাংকিং চাকরির মানদণ্ড দিয়ে বিচার করলে বিষয়টির পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। কারণ তমা মির্জাকে শাখা ব্যবস্থাপক, ঋণ কর্মকর্তা বা সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের দায়িত্বে নয়; বরং ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বিভাগে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে জনসংযোগ, কর্পোরেট ইমেজ, ব্র্যান্ড পজিশনিং ও যোগাযোগ দক্ষতাই প্রধান বিবেচ্য।
কেন উঠছে প্রশ্ন?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এভিপি পদটি সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের একটি ব্যবস্থাপনা পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে অনেকের ধারণা, এ পদে পৌঁছাতে দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ও অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি প্রয়োজন।
এই ধারণা থেকেই সামাজিক মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তমা মির্জার ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা কোথায়? আবার কেউ কেউ এটিকে যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচিতির প্রভাব বলেও মন্তব্য করেছেন।
কিন্তু বিষয়টির আরেকটি দিক তুলে ধরছেন কর্পোরেট পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, পদবির নাম এক হলেও সব এভিপির দায়িত্ব এক নয়। বিশেষ করে ব্র্যান্ড, বিপণন, কর্পোরেট যোগাযোগ বা জনসংযোগ বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অনেক সময় প্রচলিত ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কি আলাদা দক্ষতা?
প্রায় ১৬ বছর ধরে চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমে কাজ করেছেন তমা মির্জা। একজন অভিনেত্রীর পেশাগত জীবনের বড় অংশই জুড়ে থাকে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন, জনমনে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি, দর্শকের মনস্তত্ত্ব বোঝা, সংকটকালে জনসংযোগ বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলার মতো বিষয়।
কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এগুলো কেবল বিনোদন শিল্পের দক্ষতা নয়; আধুনিক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মূল্যবান সক্ষমতা।
একটি ব্যাংক আজ শুধু আর্থিক সেবা বিক্রি করে না; একই সঙ্গে বিক্রি করে বিশ্বাস, সুনাম, গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি। সেই জায়গায় যোগাযোগ দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং গণমাধ্যমে কার্যকর উপস্থিতি একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নতুন নয় এই ধারা
সেলিব্রিটিদের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত ভূমিকায় যুক্ত করা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুদিনের চর্চা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেবল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নয়, বরং ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি, কমিউনিকেশন, কনটেন্ট, জনসংযোগ কিংবা স্টেকহোল্ডার এনগেজমেন্টের মতো বিভাগেও পরিচিত মুখদের সম্পৃক্ত করেছে।
কর্পোরেট জগতে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড বা পারসোনাল ব্র্যান্ডিং এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন পরিচিত ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, দর্শকপ্রভাব এবং যোগাযোগক্ষমতা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের বিপণন ব্যয় কমাতে, ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা বাড়াতে এবং নতুন গ্রাহকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে সহায়তা করে।
এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান বাইরের মুখপাত্র ব্যবহার না করে, সেই ব্যক্তিকেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি কৌশলগত ভূমিকায় নিয়ে আসে।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও রয়েছে একই নজির
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়াবিদদের বিশেষ কোটায় নিয়োগ দিয়ে আসছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার, ফুটবলার কিংবা অন্যান্য খেলোয়াড়দের অনেকেই ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন, যদিও তাদের অধিকাংশেরই পূর্ব ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ছিল না।
সেখানে নিয়োগের ভিত্তি ছিল তাদের ক্রীড়া অর্জন, নেতৃত্বগুণ, শৃঙ্খলা, জনস্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতা।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন ব্যাংকে ক্রীড়াবিদদের নিয়োগের নজির রয়েছে। ব্যাংকগুলো মনে করে, একজন সফল খেলোয়াড় প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং সামাজিক উপস্থিতি শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
এই যুক্তিতেই প্রশ্ন উঠছে—যদি একজন অ্যাথলেটের ক্রীড়া জীবন কর্পোরেট সম্পদ হতে পারে, তবে দীর্ঘদিনের একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর যোগাযোগ দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততাকে কেন কর্পোরেট সম্পদ হিসেবে দেখা যাবে না?
‘ভ্যানিটি টাইটেল’ বিতর্ক
তমা মির্জার নিয়োগ নিয়ে আলোচনার আরেকটি শব্দ হলো ভ্যানিটি টাইটেল। কর্পোরেট জগতে এই ধারণাটি এমন কিছু পদবিকে বোঝায়, যেখানে পদটির মূল্য শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং দৃশ্যমানতা, প্রভাব, অবস্থানগত গুরুত্ব এবং স্টেকহোল্ডার সম্পর্কও বিবেচনায় থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যানিটি টাইটেল মানেই পদটি অর্থহীন—এ ধারণা সঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি কৌশলগত পজিশনিং টুল, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিদ্যমান সুনাম ও প্রভাবকে যুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ পদবিটি যেমন মর্যাদা দেয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিনিধিত্ব ও দায়িত্ব প্রত্যাশা করা হয়।
অভিজ্ঞতা মানেই কি শুধু ব্যাংকিং?
সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো ‘অভিজ্ঞতা’। কিন্তু আধুনিক কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
একজন অভিনেতার পেশাগত জীবনে প্রতিদিনই থাকে জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়া, ব্র্যান্ড প্রতিনিধিত্ব, সংকট মোকাবিলা, গণমাধ্যম পরিচালনা, দর্শকের আচরণ বিশ্লেষণ এবং ইতিবাচক জনমত গড়ে তোলার কাজ। এগুলো কর্পোরেট যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দক্ষতা।
জানা যায়, তমা মির্জা আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেছেন, যা কর্পোরেট পরিবেশে নীতি, চুক্তি ও পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটি একাডেমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শেষ কথা নির্ধারণ করবে পারফরম্যান্স
তবে কর্পোরেট বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়োগকে আগেভাগেই সফল বা ব্যর্থ বলা সমানভাবে অযৌক্তিক। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে—তমা মির্জার দায়িত্ব কী, তিনি কী ধরনের ব্র্যান্ড কৌশল বাস্তবায়ন করেন এবং এ বি ব্যাংকের জন্য কতটা পরিমাপযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করতে পারেন।
সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের ভাষা যেমন বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করতে পারে, তেমনি অন্ধ সমর্থনও বাস্তব মূল্যায়নের বিকল্প নয়। বরং এটিকে একটি অপ্রচলিত কর্পোরেট ব্র্যান্ড পজিশনিং উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার সাফল্য নির্ভর করবে ফলাফলের ওপর।
কর্পোরেট বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। আজ একজন পেশাজীবীর মূল্যায়ন শুধু পূর্ববর্তী চাকরির পদবি বা একাডেমিক ডিগ্রি দিয়ে হয় না; তার যোগাযোগক্ষমতা, নেটওয়ার্ক, জনআস্থা, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড এবং প্রভাবও অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে ওঠে।
সেই অর্থে তমা মির্জার এ বি ব্যাংকে যাত্রা একটি নতুন ধরনের কর্পোরেট পরীক্ষাও বটে। আর এই পরীক্ষার প্রকৃত উত্তর মিলবে পদবি দিয়ে নয়, ভ্যালু ক্রিয়েশন দিয়ে।![]()