রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তিতে এ সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ প্রয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।
রাজধানীর হোটেল শেরাটনে গতকাল ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি আয়োজিত ‘কনফ্লুয়েন্স ২০২৬: আ কনভেনিং অব পার্টনারশিপ, অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যান্ড কমিটমেন্ট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্তি এবং সংকটের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার জন্য এ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ তৈরির পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনসহ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই বিস্মৃত সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এ সংকটের সমাধানকে বৈদেশিক নীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে। শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকট পরিচালনা নয়, এর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান অর্জনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, নয় বছর ধরে চলা এ সংকট গতানুগতিক পদ্ধতিতে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। মানবিক সহায়তার তহবিল কমে আসছে এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগও অন্য সংকটের দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে সংকটের টেকসই সমাধান এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী লাকি করিম বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু করার আগে রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও টেকসই জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমাতে শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে দুটি প্যানেল আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধি, দাতা সংস্থা, মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিদরা রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
আলোচনায় অংশ নেন এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশনাল ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের কর্মকর্তা হামাহ হোসেন এবং আইআরসি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ রিয়াসসহ সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দেশি-বিদেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।![]()