বিশ্ব
নেপাল বিপর্যয়
বিশেষ প্রতিনিধি | কাঠমান্ডু পোস্ট, বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অবলম্বনে
লাংটাং অঞ্চলের হিমবাহ, ত্রিশূলী উপত্যকায় উদ্ধার অভিযান এবং সীমান্তবর্তী লেন্দে খোলা নদী—এই পার্বত্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাই এবারের বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
হিমালয়কে একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল প্রাকৃতিক দুর্গ মনে করা হতো। হাজার বছরের বরফ, পাথর আর চিরতুষারের স্তর যেন পাহাড়কে অটুট করে রেখেছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঁচু পর্বতের বরফ গলছে, পাথরের ভিত আলগা হচ্ছে, আর পাহাড়ের ঢাল হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং ক্রমেই নিয়মিত হয়ে উঠছে।
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে বুধবারের ভয়াবহ হিমবাহ ধস সেই বাস্তবতারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যমতে, এ দুর্যোগে দুই দেশের অন্তত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি পর্যটক, শ্রমিক ও সীমান্তপথে যাতায়াতকারী ব্যক্তি। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ধসে যাওয়া কাদা, পাথর ও বরফের স্তূপ এতটাই বিশাল যে বহু এলাকা এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এক পাহাড় ধস, তারপর কয়েক মিনিটে বদলে যায় পুরো উপত্যকা
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে। সেখানে কয়েক মিলিয়ন ঘনমিটার বরফ ও শিলা একসঙ্গে ভেঙে নিচে নেমে আসে। প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা সেই ধস সীমান্তের ওপারে তিব্বতের লেন্দে খোলা নদীতে আছড়ে পড়ে।
এরপর যা ঘটে, তাকে ভূবিজ্ঞানীরা বলেন ‘ক্যাসকেডিং ডিজাস্টার’—অর্থাৎ একটি ঘটনা থেকে পরপর আরও কয়েকটি বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়া। ধসে নদীর প্রবাহ মুহূর্তের মধ্যে আটকে যায়, পরে সেই অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে বিশাল জলরাশি নিচের উপত্যকায় ধেয়ে আসে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি গ্রাম, সড়ক, সেতু এবং নদীতীরবর্তী বসতিগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।
ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় বহু জায়গায় নদীর গতিপথ বদলে গেছে। সীমান্তবর্তী জিরং স্থলবন্দর কার্যত ধ্বংস হয়ে পড়েছে। অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল ও তিব্বতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কেন দুর্বল হয়ে পড়ছে পাহাড়?
আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাবগুলোর একটি হচ্ছে উঁচু পর্বতের অদৃশ্য ভাঙন।
তাঁর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। বরফ এত দিন পাথরগুলোকে আঠার মতো ধরে রাখত। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ায় সেই প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
বিষয়টি শুধু বরফ গলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা কয়েকটি পরস্পর-সংযুক্ত প্রক্রিয়ার কথা বলছেন—
- তাপমাত্রা বাড়ায় স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট গলে যাচ্ছে।
- গলিত বরফের পানি পাথরের ফাটলে ঢুকে কাঠামো দুর্বল করছে।
- দিন-রাতের জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার চক্র শিলাকে ভঙ্গুর করে তুলছে।
- অতিবৃষ্টি পাহাড়ি ঢালে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
ফলে একটি ছোট ভূকম্পন বা ভারী বৃষ্টিপাতও বিশাল শিলাধসের সূচনা করতে পারে।
বিপর্যয়ের পেছনে কি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন?
না। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এবারের দুর্যোগকে কেবল একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
নেপালভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের মতে, পাহাড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফের স্থিতিশীলতা আগেই কমে গিয়েছিল। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক ভূকম্পন ও মৌসুমি বৃষ্টিপাত যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তোলে।
হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন হর্টনও একই মত দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি বহু ঘটনার সম্মিলিত ফল। হিমবাহ ক্ষয়, বরফে জমাট মাটির গলন, দুর্বল পাহাড়ি ঢাল এবং ভূমিকম্প—সব মিলেই এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছে।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি বন্যা সৃষ্টি না করলেও, এটি পাহাড়কে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে যেখানে বড় দুর্যোগের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিমালয়ের সতর্ক সংকেত
গত কয়েক বছরে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের একাধিক বিপর্যয় ঘটেছে।
২০২৪
থামে গ্রাম
হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যায় শেরপা অধ্যুষিত গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫
জিরং সীমান্ত
তিব্বত–নেপাল সীমান্তে প্রবল বন্যায় সড়ক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৩
সিকিম
হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণে ভারতীয় হিমালয়ে ভয়াবহ প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা নয়; বরং পুরো হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ুর ধারাবাহিক লক্ষণ।
৩০ বছরে এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে নেপাল
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত মাত্র তিন দশকে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সর্বশেষ দশকে হিমবাহ গলার গতি আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
নিচের পরিসংখ্যানগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে—
বরফ হারিয়েছে
১/৩
৩০ বছরে নেপালের তুষারাবৃত অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিলীন
গলনের গতি
৬৫%
সর্বশেষ দশকে আগের দশকের তুলনায় হিমবাহ গলার হার বৃদ্ধি
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হিমালয়ের হাজারো হিমবাহ হ্রদ আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। ফলে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যার সংখ্যা এবং তীব্রতা দুটোই বাড়তে পারে।
উদ্ধার অভিযান এখন সময়ের সঙ্গে লড়াই
নেপালের সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা হেলিকপ্টার এবং ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু ধসে যাওয়া পাহাড়ি সড়ক, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাত তাঁদের কাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
ত্রিশূলী উপত্যকার বহু এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। নদীর তলদেশে কয়েক মিটার পুরু কাদা জমে থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে বিশেষ অনুসন্ধান দল কাজ করছে।
কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, নিখোঁজের বড় একটি অংশ হয়তো সীমান্তবর্তী নদীপথে ভেসে গেছে। ফলে চীন, নেপাল এবং ভাটির দিকে ভারতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও সমন্বিত অনুসন্ধানে যুক্ত করা হয়েছে।
হিমালয় শুধু নেপালের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংকট
হিমালয়কে প্রায়ই ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। কারণ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর পর পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বরফ রয়েছে এই পর্বতমালায়। এখান থেকেই উৎপত্তি হয়েছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, ইয়াংসি ও মেকংসহ এশিয়ার বহু প্রধান নদীর।
অর্থাৎ হিমালয়ের বরফ গলার প্রভাব শুধু নেপাল বা তিব্বতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শতকোটি মানুষের পানি, কৃষি, বিদ্যুৎ এবং নদীনির্ভর জীবনযাত্রাও এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর বৈশ্বিক উদ্যোগ যত বিলম্বিত হবে, হিমালয়ের এমন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল তত বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। আর বুধবারের লাংটাং বিপর্যয় হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় দুর্যোগের একটি সতর্ক সংকেত মাত্র।![]()