নিজস্ব প্রতিবেদক
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন একটি পথ খুলতে যাচ্ছে। দেশটিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ডলার–সংকটের কারণে ক্রেতারা সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে না পারলেও এখন সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দুবাইয়ের মতো তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানির মূল্য বাংলাদেশে আনার অনুমতি মিলছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মূল্য তৃতীয় দেশ থেকে গ্রহণের একটি আবেদন অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন শিগগিরই জারি হবে।
জানা গেছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুড গত জুলাইয়ে এনবিআরের কাছে আবেদন করে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে আগ্রহী। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে তারা নিজ দেশ থেকে অর্থ পাঠাতে পারছেন না। এজন্য তারা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দুবাইয়ে থাকা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক হিসাব থেকে মূল্য পরিশোধ করতে চান।
রপ্তানিতে মিলবে নতুন সুবিধা
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদনটি পর্যালোচনার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু রপ্তানি আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধানেও এর সুযোগ রয়েছে, তাই অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগ ২০১৮ সালের এক প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট শর্তে ভিন্ন দেশ থেকে রপ্তানির মূল্য গ্রহণের সুযোগ দিয়েছিল। নতুন অনুমোদন সেই বিধানের আওতাতেই কার্যকর হবে।
তবে টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পৌঁছায়নি। ফলে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন রপ্তানিকারকেরা।
এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের মালিক এম ডি আলম বলেন, মিয়ানমারে সিমেন্টের বড় চাহিদা রয়েছে, কারণ সেখানে উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত। পাশাপাশি আলু ও বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেক সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।
যুদ্ধের মধ্যেও বাড়ছে রপ্তানি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমারে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, আলু, সুতা ও পাটজাত পণ্য।
বাংলাদেশ–মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, মিয়ানমারের অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। ফলে তারা সেসব দেশ থেকে বৈধভাবে বিল পরিশোধ করতে পারেন, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে। আগে সেখানে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থাকলেও এখন সেটি কার্যক্রমে নেই।
করিডর ঘিরে বাড়ছে সম্ভাবনা
মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত ব্যবসায়ীরা চীন–মিয়ানমার–চট্টগ্রাম প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এই করিডর বাস্তবায়িত হলে শুধু মিয়ানমার নয়, চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও স্থলপথে দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। এতে বর্তমান প্রায় ১০ দিনের পরিবহন সময় কমে এক দিনের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।
তবে কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মুর্শেদ সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিমেন্ট রপ্তানিতে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন। আশঙ্কা রয়েছে, নির্মাণসামগ্রী সামরিক অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। তাই নিরাপত্তা বিবেচনায় যথাযথ যাচাই–বাছাই অব্যাহত রাখা জরুরি।
![]()