সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলারের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭.৮ শতাংশ। তবে এই বৃদ্ধি দেখে উৎপাদন বা রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রকৃত চিত্র হলো, দাম বেড়েছে বেশি, পরিমাণ নয়।
কেন রপ্তানি মূল্য বেড়েছে?
মূল কারণ কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি।
গত বছরের বন্যায় পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে কাঁচা পাটের সরবরাহ কমে যায়। ফলে প্রতি মণ পাটের দাম ৩,০০০–৩,৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫,৫০০–৬,০০০ টাকায় পৌঁছে। এই উচ্চমূল্যের প্রভাব সরাসরি রপ্তানি পণ্যের দামে পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে, আগে যে পাটসুতা বা পাটপণ্য ১,০০০ ডলারে রপ্তানি হতো, এখন সেটিই ১,২০০–১,৩০০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ফলে ডলারের হিসাবে রপ্তানি আয় বেড়েছে, যদিও রপ্তানিকৃত পণ্যের ওজন বা পরিমাণ প্রায় একই থেকেছে।
সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে পাটের সুতা, যা মোট রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি।
কিন্তু পরিমাণ কমল কেন?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
- কাঁচা পাট রপ্তানি নেমেছে ১.৬৭ লাখ টন থেকে মাত্র ৩৮ হাজার টনে।
- পাটসুতার রপ্তানি মূল্য বেড়েছে ১৮ শতাংশ, কিন্তু পরিমাণ কমেছে ২ শতাংশ (৪.৩৮ লাখ টন থেকে ৪.২৮ লাখ টন)।
অর্থাৎ, রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি মূলত মূল্যস্ফীতিনির্ভর, উৎপাদন বা বাজার সম্প্রসারণনির্ভর নয়।
বহুমুখী পণ্যে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?
বিশ্ববাজারে এখন শুধু বস্তা বা সুতা নয়, বরং উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ
- গৃহসজ্জার পণ্য
- টেকনিক্যাল টেক্সটাইল
- অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত জুট কম্পোজিট
- বাগান ও প্যাকেজিং সামগ্রী
- পাটকাঠির চারকোল
তবু বাংলাদেশের বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমেছে। কারণ হিসেবে উদ্যোক্তারা দুটি বিষয় তুলে ধরছেন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় বাজারে ক্রয়াদেশ ২০–২৫ শতাংশ কমে যাওয়া এবং কাঁচা পাটের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া।
সামনে কী করতে হবে?
বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় এবং বছরে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাত থেকে কয়েক শ কোটি ডলারের পরিবর্তে বহু গুণ বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব, যদি তিনটি ক্ষেত্রে জোর দেওয়া যায়—
- কাঁচা পাটের স্থিতিশীল সরবরাহ ও মূল্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা
- নতুন বহুমুখী পাটপণ্য উদ্ভাবনে গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ বাড়ানো
- বিদেশি বিনিয়োগ ও নতুন রপ্তানি বাজারে প্রণোদনা দেওয়া
সারকথা, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের রপ্তানি বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটি মূলত দামের কারণে অর্জিত প্রবৃদ্ধি। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের পাট খাতকে কাঁচামাল রপ্তানির বাইরে উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্যের দিকে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।