মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ডের ইল্ড বা ফলন বেড়েছে। এতে নতুন ঋণ নিতে গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর বাড়তি ব্যয়ও বাড়ছে। জি৭ জোটভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ঋণ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের মার্চের মধ্যে এ ব্যয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের বন্ড ইস্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত ঋণ ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, জি৭-এর প্রায় সব দেশের বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি বন্ডের ইল্ড যুদ্ধ শুরুর আগের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন বেশি। ফলে নতুন করে ঋণ নিতে সরকারগুলোকে আগের চেয়ে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।
এই বাড়তি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশের চাপ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। দেশটির অতিরিক্ত ঋণ ব্যয় এরই মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। জি৭-এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় এবং দেশটির সরকারি বন্ডের বাজারও বিশ্বে সবচেয়ে গভীর। তাই ইল্ড বৃদ্ধির প্রভাবও দেশটির অর্থনীতিতে তুলনামূলক বেশি পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের মার্চ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সুদ ব্যয় আরো প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলার বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সরকারি বন্ডের ইল্ড দ্রুত বেড়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। এর সঙ্গে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও যুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার মাধ্যমে ইল্ড নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও তাতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। বরং বাজারে সরকারের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর অন্য বড় অর্থনীতিগুলোও একই ধরনের চাপে রয়েছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ও জাপানের মতো দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়লে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ডও বাড়ে। ফলে এসব দেশের সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের বন্ড ইল্ডের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। আর আগামী মার্চ নাগাদ সম্ভাব্য ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের হিসাব করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বন্ড ইস্যু পরিকল্পনার ভিত্তিতে। এতে কোন দেশ কত পরিমাণ ও কী মেয়াদের বন্ড বাজারে ছাড়বে, সেই তথ্যও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
উচ্চ সুদহার শুধু সরকারের ঋণ ব্যয়ই বাড়াচ্ছে না, আর্থিক বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। জেফরিজের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার মনে করেন, সুদহার বৃদ্ধি শেয়ার ও ঋণবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশের ওপরে উঠলে শেয়ারবাজারে চাপ আরো বাড়তে পারে।
কারণ বন্ডের ইল্ড বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ারের তুলনায় বন্ড বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও মুনাফা—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সরকারি ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন ব্যয়েও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এখন বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকারগুলো ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনও বাড়ছে। ফলে সরকারি অর্থের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে বাজার থেকে সরকারগুলোর ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়লে বন্ডের বাজারে সরবরাহও বাড়ে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হলে ইল্ডের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ। সাম্প্রতিক সময়ে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের একটি বড় অংশ বেসরকারি প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে চলে যাচ্ছে। সরকারি বন্ডসহ অন্যান্য বিনিয়োগমাধ্যমে অর্থের প্রবাহ কমে গেলে সেখানেও ইল্ড বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
পিটারসন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোসেন মনে করেন, শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকিও বন্ডের বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরকারি ঋণের ব্যয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি-বিবেচনা আরো বদলে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা, জনসংখ্যাগত চাপ, অবকাঠামো এবং সবুজ বিনিয়োগে সরকারের ব্যয় আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলে সরকারি ঋণের চাহিদাও বাড়বে। তার ওপর এআই অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্প্রসারণ অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার আগের তুলনায় বেশি থাকার একটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন আইএনজির প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ জেমস নাইটলি। তার মতে, বাড়তি ঋণ ব্যয় এখন শুধু সরকারি হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পরিবার ও কোম্পানির ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আবাসন বাজারে। ইল্ডের ব্যবধান আরো বাড়লে দেশটিতে বন্ধকি ঋণের সুদ ৭ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তবে সরকারি বন্ডের ইল্ডের সাম্প্রতিক উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিশ্লেষকরা। মরগ্যান স্ট্যানলির ইউরোপীয় সুদহার কৌশল বিভাগের প্রধান জিয়ানলুকা সালফোর্ডও ইল্ড বৃদ্ধিকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি জি৭ দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে, একই সময়ে সরকারের ঋণও বাড়ছে। প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বাড়তি ব্যয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্যও বিপুল অর্থের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ফলে একদিকে সরকারের ঋণের প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্ডের ইল্ড যদি আরো বাড়ে, তাহলে শুধু জি৭ দেশগুলোর সরকারি অর্থব্যবস্থাই নয়, বিশ্বব্যাপী ঋণবাজার, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।![]()