কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়। ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্যের বাড়তি চাহিদার সুফল পাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশটির মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ৭৭ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
ভিয়েতনামের পরিসংখ্যান কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশটির রফতানি হয়েছে ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল রফতানির চেয়ে ২ হাজার ৫০ কোটি ডলারের বেশি। ফলে আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে দেশটি।
রফতানি আয়ের বড় অংশ এসেছে ইলেকট্রনিকস খাত থেকে। আট মাসে ভিয়েতনাম থেকে ১০ হাজার ১০০ কোটি ডলারের ইলেকট্রনিকস পণ্য রফতানি হয়েছে। এ খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের পেছনে এআইনির্ভর ডেটা সেন্টার ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বজুড়ে এআইভিত্তিক সেবা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, চিপ, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করছে ভিয়েতনামে স্থাপিত কারখানাগুলো। একই সঙ্গে চীন থেকে উৎপাদন কার্যক্রম সরিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানি ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করায় দেশটির উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়ছে।
রফতানি বৃদ্ধিতে বিদেশী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বছরের প্রথম আট মাসে এসব প্রতিষ্ঠানের রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে একই সময়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রফতানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ভিয়েতনামের রফতানি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগনির্ভর উৎপাদন খাতের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনামের পণ্যের অন্যতম বড় বাজার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির সঙ্গে ভিয়েতনামের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই ভিয়েতনামের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি ছিল।
তবে রফতানি বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানিও বেড়েছে। ভিয়েতনামের উৎপাদন খাত এখনো চীনের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ভিয়েতনামের মোট আমদানির মধ্যে চীন থেকেই এসেছে ১৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের বর্তমান বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রবণতা একই সঙ্গে কাজ করছে। একদিকে এআই ও প্রযুক্তিপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উৎপাদন কার্যক্রমে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
তবে আমদানিনির্ভর উৎপাদন কাঠামোর কারণে রফতানি বাড়লেও দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি হয়নি। বরং বছরের প্রথম আট মাসে আমদানি রফতানিকে ছাড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য ভিয়েতনামের বৈদেশিক নির্ভরতাও বাড়ছে।
তারপরও বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় ভিয়েতনামের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ও ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ইলেকট্রনিকসসহ প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন ও রফতানিতে দেশটির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভিয়েতনামের শিল্প খাতে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।![]()