বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জমা দেন। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় নথিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণার বাজার, যেখানে কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা ও শিক্ষা–কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া আর্থিক সক্ষমতার কাগজ তৈরি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা আমানত রয়েছে—এমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর প্রকৃত আমানত না থাকলেও কৃত্রিমভাবে হিসাবের স্থিতি বাড়িয়ে সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে।
প্রতারণার একটি প্রচলিত কৌশল হলো, শিক্ষার্থী অল্প পরিমাণ অর্থ জমা রাখার পর সেই টাকাকে জামানত দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে ঋণ সৃষ্টি করা হয়। একই অর্থ কয়েক দফা ঘুরিয়ে হিসাবের স্থিতি ৫০–৬০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে এবং পরে সেই হিসাব থেকেই স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়।
এই অনিয়মে বিদেশি দূতাবাসগুলোর উদ্বেগও বেড়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মিশন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে যে, ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও ক্রমশ বাড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ১২ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ভিসা-সংক্রান্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দেয়। ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে হিসাবধারীর নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর, শুরুর ও শেষ স্থিতি এবং নথি তৈরির তারিখ যাচাই করার কথা বলা হলেও এখনো অনেক ব্যাংকে নির্দেশনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইস্যু করা নৈতিকতা-বিরোধী এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিষয়টি ব্যাংক নির্বাহীদের সভায়ও উত্থাপন করা হবে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ধরনের ঋণ চালু করেছি। শিক্ষার্থীরা নিয়মনীতি মেনেই এসব ঋণসেবা নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। সারা বিশ্বেই শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে। সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পর লেখাপড়া চালিয়ে যান না এবং ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন না। এ কারণে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনও বলেছেন, প্রকৃত আমানত ছাড়া অর্থের বিনিময়ে স্টেটমেন্ট বা সলভেন্সি সার্টিফিকেট তৈরি করা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার অপব্যবহার। তার মতে, শুধু কিউআর কোড নয়, কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইযোগ্য ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী ৫৫টি দেশে পড়তে গেছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়েছে ৮৯ কোটি ডলার, যা প্রায় ১০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকার সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প কিছু মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।![]()