পুঁজিবাজারে নতুন আইপিও ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। একই সঙ্গে বাজারের স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্রোকারেজ হাউজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং অস্থিরতা নিরসনে ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। গতকাল বেলা ১১টায় ভার্চুয়ালি এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, নজরদারি ও পরিপালন কার্যক্রমসহ পুঁজিবাজারের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি দূর করতে এ ধরনের মতবিনিময় সভা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে অধিকাংশ ব্রোকার ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তাই বাজারের আস্থা ও কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ডিএসই, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাজারকে দমন নয়; বরং একটি কমপ্লায়েন্ট, প্রাণবন্ত, দক্ষ ও বিকাশমান পুঁজিবাজারে রূপান্তর করাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
নতুন আইপিও ও আর্থিক পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোকে ডিএসইর অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাজারে নতুন আইপিও না আসা এবং ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজের সীমিত উপস্থিতি পুঁজিবাজারের অন্যতম দুর্বলতা। এ পরিস্থিতিতে নতুন বন্ডের লিস্টিং ফি কমানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত আইপিও বা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আবেদনকারী কোম্পানির প্রথম বছরের লিস্টিং ফির ৫০ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রসঙ্গে মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পরিচালনা পর্ষদ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে না; বরং নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়। নির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়েই তদন্ত বা অনুসন্ধান করা হবে।’
সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘সিসি অ্যাকাউন্ট, শেয়ার বা অন্যান্য সম্পদে কোনো ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত নিজ উদ্যোগে সমাধান করতে হবে। এ ধরনের ঘাটতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নয়; পুরো বাজারের ইকোসিস্টেমের সুনামকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।’
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৫ সালের কমপ্লায়েন্স ও সার্ভেইল্যান্স সংক্রান্ত কিছু ইন্সপেকশন কার্যক্রম এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। এসব কার্যক্রম বিএসইসিতে প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। ইন্সপেকশন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই সম্প্রতি বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে পরিদর্শন করা হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেয়া বক্তারা অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বেশি পরিমাণ শেয়ার লেনদেন হলেই সেটিকে অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। লেনদেনের ধরন, শেয়ারের দামের ওপর প্রভাব, বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে লেনদেন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এদিকে গতকাল পুঁজিবাজারে সূচকের পাশাপাশি অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৩৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসে এ সূচক ছিল ৫ হাজার ৫৬৭ পয়েন্ট।
নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ ছয় পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১০৮ পয়েন্টে নেমেছে। আগের কার্যদিবসে সূচকটি ছিল ২ হাজার ১১৪ পয়েন্ট। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস পাঁচ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১১০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল ১ হাজার ১১৫ পয়েন্ট।
সূচকের পতনে গতকাল সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে পূবালী ব্যাংক, মালেক স্পিনিং মিলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, লাফার্জহোলসিম ও এশিয়াটিক ল্যাবের শেয়ার।
ডিএসইতে গতকাল মোট ৫৯০ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ হাতবদল হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা। এদিন এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৮৩টির, কমেছে ২৫২টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৬১টির।
খাতভিত্তিক লেনদেনে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ অংশ নিয়ে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত। সাধারণ বীমা খাতের অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ৯ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাত। ব্যাংক খাতের অংশ ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
দিনটিতে বেশির ভাগ খাতেই নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এর মধ্যে বস্ত্র খাতে ১ দশমিক ৭ শতাংশ, সিরামিক খাতে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা, সিমেন্ট ও পাট খাতে ১ দশমিক ১ শতাংশ করে নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে।![]()