বীমা কোম্পানিগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের বৈধ দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের সম্পদ বিক্রি করে হলেও পাওনা পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে বীমা খাতে অনিয়ম ও লুটপাট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয় পরিদর্শন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক খাতের মতো বীমা খাতেও অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধে বীমা কোম্পানিগুলোকে সময় বেঁধে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধ করতে না পারলে প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে।
আইডিআরএর অনিরীক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে দেশের বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবি ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমা খাতে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
জীবন বীমা খাতে এ সময়ে ৩৩ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। সাধারণ বীমা খাতে পরিস্থিতি আরও নাজুক। এ খাতে অনিষ্পন্ন দাবির হার ৭১ শতাংশ। ফলে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে বীমা কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির আওতায় আনা হবে। সব কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আসতে হবে এবং সব ধরনের লেনদেন অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। প্রয়োজনে বীমা খাতের আইন ও বিধিবিধানে পরিবর্তন আনা হবে। পাশাপাশি আইডিআরএর জনবল বাড়ানো এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে সংসদের মাধ্যমে আনা হতে পারে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের বীমা খাতকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নেওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ বীমায় বিনিয়োগ করেন। দুর্দিনে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে তাদের। কিন্তু বীমা কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করায় খাতটির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
আইডিআরএর তথ্য বলছে, জীবন বীমা খাতে মোট অনিষ্পন্ন পলিসির সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৬। এ খাতে অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৯০ শতাংশের দায় পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির। ফলে কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতার প্রভাব পুরো জীবন বীমা খাতের ওপর পড়ছে।
কোম্পানিভেদে দাবি নিষ্পত্তির চিত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি তুলনামূলকভাবে সময়মতো দাবি পরিশোধ করলেও সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পাওনা অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৮২টি। এর মধ্যে জীবন বীমা কোম্পানি ৩৬টি এবং সাধারণ বীমা কোম্পানি ৪৬টি। জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩৫টি বেসরকারি ও একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। সাধারণ বীমা কোম্পানির মধ্যে ৪৫টি বেসরকারি এবং একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন।![]()