বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান আকার, শিল্পভিত্তি ও বড় ভোক্তা বাজার দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করেন দেশটির সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু। তার মতে, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতনির্ভর থাকলেও এখন প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা ও বিনিয়োগে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সময় এসেছে।
ইয়ো হান-কু বলেন, ‘বাংলাদেশ আমার দ্বিতীয় শহর।’ বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পভিত্তি ও বৃহৎ বাজার দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামে কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়াকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
গত ৩ ও ৪ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা সিইপিএ নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইয়ো হান-কু। এর একদিন পর, ৪ আগস্ট দুই দেশ সিইপিএ আলোচনা সম্পন্ন করে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্যের জন্য একই ধরনের সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।
ইয়ো হান-কুর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রচলিত বাণিজ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। তার মতে, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এখন প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও নতুন শিল্পখাতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যও এ সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরছে। সিইপিএর মাধ্যমে কোরীয় গাড়ি ও পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির রপ্তানির ভিত্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি অবকাঠামো, উৎপাদন ও ডিজিটাল শিল্পে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও চুক্তিটির গুরুত্ব রয়েছে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের দিক থেকে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ কোটি ১৬ লাখ ডলার এবং এর বড় অংশই তৈরি পোশাক।
এ অবস্থায় সিইপিএর মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্যসহ অন্যান্য শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে বাজারসুবিধা কাজে লাগাতে উৎপাদনের সক্ষমতা, পণ্যের মান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইয়ো হান-কুর মতে, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের কাঠামো আগামী দুই দশকে দুই দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তার ভাষায়, চুক্তির মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য আইনি কাঠামো তৈরি হবে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশে কোরীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনাও এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদন খাতে যুক্ত রয়েছে। সিইপিএ কার্যকর হলে বাজারসুবিধার পাশাপাশি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে নতুন কোরীয় কোম্পানি বাংলাদেশে উৎপাদন স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের তুলনামূলক বড় শ্রমবাজার ও ভোক্তা বাজারের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলে উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইয়ো হান-কু দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সিইপিএ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে বাণিজ্য চুক্তিকে শুধু শুল্ক কমানোর কাঠামো হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তি হিসেবে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ অংশীদারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরবরাহ ব্যবস্থায় অবস্থান শক্তিশালী করা। দক্ষিণ কোরিয়া বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি আরও গভীর হলে কোরীয় কোম্পানিগুলোর জন্য দেশটি শুধু একটি ভোক্তা বাজার নয়, বরং উৎপাদন ও রপ্তানির একটি সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্ব পেতে পারে।
ফলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় শুধু তৈরি পোশাকের বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এমন একটি সম্ভাবনার কথাই উঠে এসেছে ইয়ো হান-কুর বক্তব্যে। বড় বাজার, শিল্প সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সিইপিএ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।![]()