বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করতে চায় মালয়েশিয়া। দেশটির বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুহাদা বিন ওসমান বলেছেন, দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে এ উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, ইসলামী অর্থায়ন ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ার ৬৯তম জাতীয় দিবস ও মালয়েশিয়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনায় দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানের বক্তব্যে হাইকমিশনার দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রবাসী, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মোহাম্মদ সুহাদা বিন ওসমান বলেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। তবে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের নেতারা মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদ প্রতিষ্ঠা দুই দেশের বেসরকারি খাতকে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আরও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মালয়েশীয় কোম্পানিগুলোর এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। টেলিযোগাযোগ খাতে রবি ও ইডটকোর কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ভবিষ্যতে প্রচলিত খাতের পাশাপাশি নতুন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে হাইকমিশনার বলেন, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, হজ ব্যবস্থাপনা, ইসলামী অর্থায়ন ও কৃষিতে দুই দেশের জন্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যোগাযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতেও মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ সুহাদা বিন ওসমান। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা সরাসরি ধারণা পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার ওপরও গুরুত্ব দেন হাইকমিশনার। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন এবং ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দেশটিতে পড়াশোনা করছেন। শিক্ষা, পর্যটন ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ানের খাতভিত্তিক সংলাপ অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং মালয়েশিয়া এ বিষয়ে গঠনমূলক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপিতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিও মালয়েশিয়ার সমর্থনের কথা জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটেও বাংলাদেশের প্রতি মালয়েশিয়ার সংহতি অব্যাহত থাকবে বলে জানান হাইকমিশনার। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই সংকটের স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত। আসিয়ান, ওআইসি ও জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে এ বিষয়ে মালয়েশিয়া কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।
দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মোহাম্মদ সুহাদা বিন ওসমান বলেন, গত বছর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ অবদান রয়েছে।
বক্তব্যে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন তিনি। ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার ও ফিলিস্তিনের প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থনের কথা উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি ও বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানান। তার মতে, স্থায়ী শান্তি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়েই অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এ সম্পর্ক এখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, পর্যটন, নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। হাইকমিশনারের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মালয়েশিয়ার জাতীয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মালয়েশিয়া মাদানি: কল্যাণ সবার জন্য’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরে মোহাম্মদ সুহাদা বিন ওসমান বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি শুধু রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও এ বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।![]()