বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া এক বক্তব্যে সাইদা শিনইচি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক গুরুত্বের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। জাপানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, এখন অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন সাইদা শিনইচি। তিনি বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতায় জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার। ঢাকা মেট্রোর মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে তার বক্তব্যে। তিনি জানান, জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগও চলছে।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি হিসেবে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর দুই দেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে এ ধরনের কাঠামো ভূমিকা রাখবে বলে জাপানের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধজাহাজের শুভেচ্ছা সফর, সামরিক ইউনিটের মধ্যে বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি জাপানের অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স বা ওএসএ কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে জাপান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে পাঁচটি টহল নৌযান হস্তান্তর করেছে। বঙ্গোপসাগরে নজরদারি, পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এ সহায়তার অন্যতম লক্ষ্য।
এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত একটি চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে।
জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগকেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন জাপানের রাষ্ট্রদূত। ব্যবসা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পাশাপাশি বাংলাদেশে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশ জাপানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন।
সাইদা শিনইচি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও প্রচেষ্টার ফলেই এ সম্পর্ক শক্ত ভিত্তি পেয়েছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও জাপানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের অংশ হওয়ায় বাংলাদেশকে জাপান আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। জাপানের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার আওতাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন উন্নয়ন সহযোগিতা ও অবকাঠামো প্রকল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচির বক্তব্যে দুই দেশের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বন্ধুত্বকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ই উঠে এসেছে।