দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর অর্থায়ন সংকট কাটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংককে যুক্ত করে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। এর অংশ হিসেবে ‘ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট স্কিম’ (সিইএস) চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পিকেএসএফের অংশীদার সংস্থাগুলো তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও উদ্যোক্তাকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে পিকেএসএফ।
২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখই ক্ষুদ্র উদ্যোগ। দেশের মোট ব্যবসার ৯৫ শতাংশের বেশি এবং প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এসব ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। তবে স্থানীয় বাজারে সফল হলেও বৃহত্তর বাজারে প্রবেশ, উৎপাদন বাড়ানো ও পণ্যের মান উন্নয়নে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং অর্থের অভাব বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে গড়ে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তার প্রয়োজনীয় ঋণের গড়ে মাত্র ১৪ শতাংশ পান। বাকি ৮৬ শতাংশ অর্থায়ন ঘাটতির কারণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশ অনেক উদ্যোক্তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৫ সালের মে মাস থেকে সিইএস বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদেরের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও উদ্যোক্তাকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে পিকেএসএফ। তবে এ খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত প্রয়োজন আরো বড়—প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোগের অর্থায়নে সম্পৃক্ত করাই সিইএসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সিইএসের আওতায় পিকেএসএফ ঋণের ঝুঁকি কমাতে তিন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রথমে ঋণগ্রহীতার যোগ্যতা যাচাই করে সার্টিফিকেট দেয়া হবে। এরপর ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা হবে। ঋণ আদায় না হলে মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমছে।
ইতোমধ্যে ১১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিইএসে যুক্ত হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ইউবিকো এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আরো কয়েকটি ব্যাংকও এ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনায় মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তারা উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকের অর্থ পৌঁছে দেবে। পাশাপাশি পিকেএসএফ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, টুলস ও ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশল ভাগাভাগি করছে। ব্যাংকের কাছে গ্যারান্টারের ভূমিকাও পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঋণের ব্যবহার ও উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে চালু করা হয়েছে মনিটরিং ও রেটিং ব্যবস্থা।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ২০২৩ সালে ‘মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ফাইন্যান্সিং অ্যান্ড ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট’ প্রকল্পে ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করা হয়। এরই অংশ হিসেবে সিইএস বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ। লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের উৎপাদন, প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়ানো।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোর ঋণ আদায়ের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যাংক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঋণ আদায়ের সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর আস্থা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।![]()