আনোয়ারায় ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের আশা, লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের আশা করছে সরকার।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু আনোয়ারা নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
সম্প্রতি শিল্পাঞ্চলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজের সূচনা হয়েছে। তবে মূল বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর।
কৌশলগত অবস্থানই সবচেয়ে বড় শক্তি
শিল্পাঞ্চলটির সবচেয়ে বড় সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সড়ক বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলটি একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু অবস্থানগত সুবিধা যথেষ্ট নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং দ্রুত বিনিয়োগ সেবা নিশ্চিত করা গেলে তবেই প্রকল্পটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর অগ্রগতি
বাংলাদেশ ও চীন সরকার যৌথভাবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় ২০১৬ সালে। সে বছর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ডেভেলপার করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০২২ সালে চীন সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় হয়। এর আগে ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ বিদেশি ঋণ সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
আধুনিক শিল্পাঞ্চলের সব সুবিধা
প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর জন্য একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণ করা হবে। এছাড়া জেটি সংযোগ সড়ক, সেতু, চার লেনের অভ্যন্তরীণ সড়ক, গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, পানি সংরক্ষণাগার, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষার জন্য প্রতিদিন আড়াই কোটি লিটার তরল বর্জ্য শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারও (সিইটিপি) নির্মাণ করা হবে।
বেজা প্রথম তিন বছরের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬০ শতাংশ প্লট শিল্পকারখানা নির্মাণের উপযোগী করার লক্ষ্য নিয়েছে। সে অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যেই বড় অংশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প করিডরের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার সম্ভাবনা
কর্ণফুলী টানেল চালুর পর মিরসরাই থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে নতুন শিল্প করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই করিডরে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়ক ও লজিস্টিক অবকাঠামো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।
ইতোমধ্যে আনোয়ারা-চন্দনাইশ সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে।
শিল্পাঞ্চলটির নিজস্ব বহুমুখী জেটি থাকায় কিছু কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নদীপথে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহারও বাড়বে
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমানে প্রত্যাশিত পরিমাণ যানবাহন না পেলেও চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলো চালু হলে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। যদিও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
অবকাঠামো ও সেবাই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, শিল্পাঞ্চলটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান। তবে শুরুতে এমন শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া উচিত, যেগুলোর জন্য গ্যাসের প্রয়োজন কম। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বিনিয়োগসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প করিডরের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আনোয়ারার এই শিল্পাঞ্চলে শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে পড়বে। শিল্পাঞ্চলটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।