কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা বাড়ছে। এর প্রভাবে মেমোরি চিপ, প্রসেসরসহ বিভিন্ন ধরনের সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতের আয় দাঁড়িয়েছে ৭৫২ বিলিয়ন ডলারে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের রাজস্ব ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বাজারটির মোট আয় ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় প্রথম তিন প্রান্তিকের আয় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি হতে পারে।
সেমিকন্ডাক্টর খাতের এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে এআই অবকাঠামো। ডেটা সেন্টার, এআই সার্ভার ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ মেমোরি ও প্রসেসিং চিপের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে চিপ নির্মাতারা উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ এআই-সম্পর্কিত পণ্যের দিকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাজারের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মেমোরি চিপ। ডিআরএএম ও ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির চাহিদা বাড়ায় এসব পণ্যের বিক্রি ও দাম উভয়ই বেড়েছে। ওমডিয়ার হিসাবে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পুরো সেমিকন্ডাক্টর বাজারের অর্ধেকের বেশি রাজস্ব এসেছে মেমোরি আইসি থেকে।
এআইয়ের জন্য ব্যবহৃত উচ্চ ব্যান্ডউইডথ মেমোরি বা এইচবিএম উৎপাদনে চিপ নির্মাতারা বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় প্রচলিত ডিআরএএমসহ অন্যান্য মেমোরি চিপের উৎপাদন সক্ষমতায় চাপ তৈরি হচ্ছে। সরবরাহ সীমিত থাকায় এসব চিপের গড় বিক্রয়মূল্যও বাড়ছে। এতে চিপ নির্মাতাদের রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এআইয়ের প্রভাব অবশ্য শুধু মেমোরি চিপের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। মেমোরি বাদ দিলে অন্যান্য সেমিকন্ডাক্টরের বাজারও দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যেখানে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সাধারণত এ ধরনের চিপের বাজারে প্রবৃদ্ধি থাকে ৩ শতাংশের কিছু বেশি।
এআই অবকাঠামোয় মাইক্রোপ্রসেসরের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মাইক্রোপ্রসেসর বা এমপিইউ থেকে পাওয়া রাজস্ব আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি থাকে প্রায় ১ শতাংশ।
ওমডিয়া চলতি বছরের শুরুতে পূর্বাভাস দিয়েছিল, এআইয়ের চাহিদার কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের রাজস্ব ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি বছরের জন্য প্রায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেকর্ড প্রবৃদ্ধির পর তৃতীয় প্রান্তিকেও ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্বের প্রত্যাশা সেই পূর্বাভাসকে আরও জোরালো করেছে।
দীর্ঘ মেয়াদেও এআই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ওই বাজারের প্রায় ৫৫ শতাংশ এআই ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং (এইচপিসি) খাত থেকে আসতে পারে। স্মার্টফোন শিল্পের হিস্যা হতে পারে প্রায় ২০ শতাংশ এবং গাড়ি শিল্পের প্রায় ১০ শতাংশ।
ফলে আগামী কয়েক বছরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্প্রসারণে এআই অবকাঠামোর ভূমিকা আরও বাড়বে। ডেটা সেন্টার, এআই সার্ভার, উন্নত প্রসেসর ও মেমোরি চিপের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিপ নির্মাতাদের উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
এরই মধ্যে সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক চাহিদার প্রভাব বড় উৎপাদক দেশগুলোর অর্থনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধি। দেশটির রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনে সেমিকন্ডাক্টর খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে বৈশ্বিক চিপ বাজারের সম্প্রসারণ দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।![]()