প্রযুক্তির এই যুগে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে, ঠিক তখনই আমেরিকার স্কুলগুলোতে দেখা যাচ্ছে এক উল্টো চিত্র। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আবারও সেই পুরোনো দিনের খাতা-কলমে ফিরিয়ে নিচ্ছেন! শুনতে একটু অবাক লাগলেও, চ্যাটজিপিটির মতো এআই চ্যাটবটগুলোর ওপর শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতেই মূলত শিক্ষকরা এই পথে হাঁটছেন।
এখনকার ছেলেমেয়েরা কোনো হোমওয়ার্ক বা অ্যাসাইনমেন্ট পেলে অনেক সময়ই নিজেরা মাথা না ঘামিয়ে সহজেই এআইয়ের সাহায্যে তা করে ফেলে। এতে হয়তো কাজ খুব দ্রুত শেষ হয়, কিন্তু তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা বা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আর এই সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে শিক্ষকদের। তাই তারা পড়াশোনা ও মূল্যায়নের নিয়মে বেশ বড়সড় পরিবর্তন আনা শুরু করেছেন।
কীভাবে আসছে এই পরিবর্তন?
শিক্ষকরা এখন বাড়ির কাজ বা হোমওয়ার্কের পরিমাণ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। এর বদলে ক্লাসে বসেই খাতা-কলমে লেখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা এবং সৃজনশীল চর্চাও আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষকরা এখন শুধু উত্তরের দিকে না তাকিয়ে, একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করছে বা সমস্যাটার সমাধান বের করছে, সেদিকে বেশি নজর দিচ্ছেন।
শিক্ষকরা এখন বাড়ির কাজ বা হোমওয়ার্কের পরিমাণ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। এর বদলে ক্লাসে বসেই খাতা-কলমে লেখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা এবং সৃজনশীল চর্চাও আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষকরা এখন শুধু উত্তরের দিকে না তাকিয়ে, একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করছে বা সমস্যাটার সমাধান বের করছে, সেদিকে বেশি নজর দিচ্ছেন।
যেমন, স্যান ফ্রান্সিসকোর এক স্কুলের শিক্ষিকা গত বছর থেকেই বাড়িতে বসে রচনা লেখার নিয়মটি পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছেন। এর বদলে তিনি ক্লাসে ছোট ছোট মৌখিক পরীক্ষা নিচ্ছেন, যা শেষ করতে ৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। এতে সহজেই বোঝা যায় শিক্ষার্থী আসলেই বিষয়টা বুঝতে পেরেছে কি না।
আরেকজন ইংরেজি শিক্ষক লক্ষ্য করেছেন, অনেক সময় অভিভাবক বা শিক্ষকদের চাপে পড়ে শিক্ষার্থীরা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নেয়। তাই তিনি এখন ক্লাসের ভেতরেই লেখালেখির জন্য অনেক বেশি সময় বরাদ্দ করেছেন। এমনকি নিউ ইয়র্কের একজন গণিত শিক্ষকও এখন বাড়িতে কম অঙ্ক করতে দেন। তিনি ক্লাসেই বেশি প্র্যাকটিস করান, যাতে সরাসরি দেখতে পারেন ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে অঙ্কটার সমাধান করছে।
মজার ব্যাপার হলো, স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নাকি বাথরুমে গিয়ে লুকিয়ে ফোন থেকে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছিল! পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক শিক্ষিকা বাধ্য হয়ে বাথরুমে যাওয়ার আগে ফোন জমা দিয়ে যাওয়ার নিয়মও চালু করেছেন।
এআই নিয়ে বিতর্কও কম নেই অবশ্য শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে সবার মত এক নয়। কেউ কেউ মনে করেন, এআইয়ের সাহায্য নিলে পড়ালেখার মান ভালো হতে পারে। হার্ভার্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ এআই টিউটর শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু এমআইটি-র আরেকটা গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র—যারা চ্যাটজিপিটি দিয়ে রচনা লিখেছে, তারা কাজ দ্রুত শেষ করলেও তাদের চিন্তাশক্তির গভীরতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশ কম ছিল।
বড়রা হয়তো তাদের কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার করে অনেক সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এর আসল প্রভাবটা কী হতে পারে, তা নিয়ে এখনো অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে। তাই শিক্ষকরা এখনই পুরোপুরি প্রযুক্তির হাতে শিক্ষার ভার ছেড়ে দিতে রাজি নন। বরং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তারা আবারও সেই পুরোনো দিনের ক্লাসরুম-ভিত্তিক পড়াশোনা আর খাতা-কলমেই বেশি ভরসা রাখছেন।