নিজস্ব প্রতিবেদক
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিযুক্ত প্রশাসকদের প্রত্যাহার করে তাঁদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব থাকবে সদ্য গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর তা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। গত ১৬ জুলাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. আবেদুর রহমান সিকদার। এরপর ধাপে ধাপে পাঁচ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করা হয়।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় থাকা এসব ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। বর্তমান সরকারও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। ব্যাংক পাঁচটির মধ্যে এক্সিম ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। অন্য চারটি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসায়ী এস আলমের সংশ্লিষ্টতা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁদের দুজনেরই রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক যোগাযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল।
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার শুরুতে এসব ব্যাংকে প্রথমে স্বতন্ত্র পরিচালক এবং পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁদের কাজ ছিল ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সচল রাখা, আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একীভূতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া।
এখন সেই দায়িত্ব থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সরে যাওয়ায় পাঁচ ব্যাংকের দৈনন্দিন পরিচালনায় নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকর হচ্ছে।
তবে নতুন ব্যবস্থাপনার সামনে বড় একটি বাস্তব সমস্যা দেখা দিয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে শুধু এক্সিম ব্যাংকে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন। অন্য চার ব্যাংকে এ পর্যায়ের শীর্ষ নির্বাহী নেই। ফলে নতুন এমডি আবেদুর রহমান সিকদারকে একসঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের কার্যক্রম তদারক করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে রয়েছে ভৌগোলিক দূরত্বের বিষয়টিও। পাঁচ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান ও মহাখালী এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষে একই দিনে সব কার্যালয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কার্যক্রম তদারক করা কঠিন। বিশেষ করে একীভূতকরণের মতো জটিল প্রক্রিয়ার সময় এ ধরনের ব্যবস্থাপনা ঘাটতি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আর সরাসরি পাঁচ ব্যাংকের ব্যবসায়িক পরিচালনায় থাকবে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংকগুলোকে পূর্ণ তদারকির মধ্যে রাখা হবে।
তিনি বলেন, দ্রুত জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের পদগুলোতে চার থেকে পাঁচজন নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। আপাতত ব্যবস্থাপনা পরিচালকই পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কার্যালয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে পুরোনো কর্মকর্তাদেরও সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা চলছে।
একীভূতকরণের সময়সীমা সম্পর্কেও একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নতুন ব্যবস্থাপনা। চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান জানিয়েছেন, আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি একক ও শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এই রূপান্তর শুধু পাঁচটি ব্যাংকের নাম ও সাংগঠনিক কাঠামো এক করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আমানত, ঋণ, খেলাপি ঋণ, শাখা, জনবল এবং সম্পদের ব্যবস্থাপনা। ফলে একীভূত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এসব সম্পদ ও দায় কীভাবে সমন্বয় করা হয় তার ওপর।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেওয়ার কথা ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার আমানতকারীদের দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাঁচ ব্যাংকে আমানতকারীদের মোট জমা প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ খেলাপি ঋণ নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশই তখন খেলাপি ছিল। এই বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে নতুন ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু আর্থিক দায় নয়, অবকাঠামোগত দিক থেকেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হবে দেশের বড় ব্যাংকগুলোর একটি। পাঁচ ব্যাংক মিলিয়ে সারা দেশে শাখা রয়েছে ৭৬০টি। উপশাখা ৬৯৮টি, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ৫১১টি এবং এটিএম বুথ ৯৭৫টি। ফলে একীভূত হওয়ার পর ব্যাংকটির কার্যক্রমের পরিধি হবে ব্যাপক।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এত বড় একটি ব্যাংককে এক কাঠামোর মধ্যে আনতে গিয়ে সামান্য ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যাংকগুলোতে নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকর করার সময় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ অনুমোদন, আমানত ব্যবস্থাপনা এবং জনবল পুনর্বিন্যাসে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, একীভূতকরণ যেহেতু শুরু হয়েছে, এটিকে যেকোনো মূল্যে সফলভাবে শেষ করতে হবে। নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দায়িত্ব দিয়ে দ্রুত শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্য জনবল নিয়োগ করা জরুরি। কোনোভাবেই যাতে রূপান্তর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয় এবং কেউ বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ না পায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হলেও এটি কোনোভাবেই তদারকি শিথিল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে না। বরং সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে এখন নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
কারণ, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে শুধু একটি নতুন ব্যাংক গঠনের চ্যালেঞ্জ নেই; একই সঙ্গে বিপুল খেলাপি ঋণ সামাল দেওয়া, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্বল সম্পদ পুনরুদ্ধার, দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে একটি কাঠামোয় আনার কঠিন কাজও রয়েছে।
প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত এবং ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে যাত্রা করতে যাওয়া এই ব্যাংকের সাফল্য তাই শুধু সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।