মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস
একটি রানওয়ে ব্যবস্থাপনার কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। ট্যাক্সিওয়েতে উড়োজাহাজকে ১০ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হওয়ায় অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের পাশাপাশি ফ্লাইটের সময়সূচিও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন।
তিনি বলেন, একটি রানওয়ের কারণে ইউএস-বাংলার একটি বোয়িং উড়োজাহাজে প্রায় ৩০০ লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়। এয়ারবাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জ্বালানি লাগে প্রায় ৯০০ লিটার। আর ছোট এটিআর উড়োজাহাজকে ২৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হলে প্রায় ৭৫ লিটার জ্বালানি অতিরিক্ত পুড়ে যায়। এর ফলে একদিকে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা অন-টাইম মেইনটেইন করতে পারি না। যাত্রী আমাদের বলে, ফ্লাইট ১৫ মিনিট ডিলে। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই।’
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, টার্মিনাল নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় এয়ার অপারেটরদের প্রয়োজন ও মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘থার্ড টার্মিনালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এয়ার অপারেটরদের কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি কী করতে চাই বা কী প্রয়োজন। অথচ থার্ড টার্মিনাল সবার আগে অপারেটরদের জন্য। অপারেটরই যাত্রীদের সুবিধা করে দেবে।’
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে দেশীয় এয়ারলাইনসকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখার ওপর জোর দেন ইউএস-বাংলার এমডি। তার মতে, বিদেশী এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভর করে এভিয়েশন হাব গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এভিয়েশন হাব করতে হলে দেশীয় এয়ারলাইনসের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী এয়ারলাইনসের কোনো ভূমিকা নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে বাংলাদেশে এভিয়েশন দাঁড়াবে না।’
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতে যাত্রীদের ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাটের বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষ্য, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর যাওয়ার সময় একজন যাত্রীকে ট্যাক্স ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় ফেরার সময় একই ধরনের খাতে নেওয়া হয় মাত্র ২০০ টাকা। সিঙ্গাপুর রুটেও বাংলাদেশ থেকে যাত্রার ক্ষেত্রে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়।
দেশীয় অভ্যন্তরীণ রুটেও কর ও ফি বাড়ছে বলে জানান তিনি। ঢাকা থেকে যশোর যেতে বর্তমানে একজন যাত্রীকে ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি বাবদ প্রায় ৭০০ টাকা দিতে হয়। এর মধ্যে ট্যাক্স ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য ফি ২০০ টাকা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম তুলনামূলক বেশি এবং টিকিট বিক্রির ওপর এয়ারলাইনসগুলোকে ৭ শতাংশ কমিশন দিতে হয় বলে জানান তিনি।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতেও দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, ইউএস-বাংলা ২০২৩ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সনদ পেয়েছে। বিধিবিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করলেও এখনো লাইসেন্স পায়নি।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিধিবিধান আছে, গ্লোবাল সার্টিফিকেশন আছে, কিন্তু লাইসেন্স নেই।’
এভিয়েশন খাতের আর্থিক সংকটের আরেকটি বড় দিক হিসেবে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে এয়ারলাইনসগুলোর পাওনার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে অপারেটরদের পাওনা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর পাওনা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছেও বড় অঙ্কের পাওনা রয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক ও বিনোদন সুবিধা থাকতে হবে।
তিনি বলেন, হাব হলে যাত্রীকে ২ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোরার ও সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় ব্র্যান্ডের রেস্তোরাঁ ও বিনোদন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ এলাকার আকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, প্রায় ১০০ বিঘা জায়গার মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করেই দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন হাব হওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবায়ন কঠিন। উদাহরণ হিসেবে তিনি সিঙ্গাপুরের বিমানবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ও বিনোদন অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করেন। সেখানে বিমানবন্দরের পাশে শুধু শপিং ও বিনোদনের জন্য ৩০ বিঘার বেশি জায়গাজুড়ে একটি বিনোদন অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের পুরনো বিধিমালা আধুনিকায়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ইউএস-বাংলার এমডি। তিনি বলেন, সিভিল এভিয়েশনের বিদ্যমান বিধিমালা ১৯৮৪ সালের। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মন্ত্রীর উদ্যোগ ছাড়া এটা হতো না। আমরা আশা করি, অচিরেই এটাকে আইনে পরিণত করা হবে।’
নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় কমবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার হিসাব অনুযায়ী, নতুন নীতির ফলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে। একই পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরও।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর ও ফি কাঠামোর ভারসাম্য, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা, বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।![]()