শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য সুলতানা আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
এর বাইরে পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি হবে।
দেশীয় গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন বাড়াতে সমুদ্রাঞ্চলেও অনুসন্ধান জোরদার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা রাখা হয়েছে।
স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে ভোলার মজুদকে কাজে লাগানোর বিষয়েও সরকার পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই সেখানে গ্যাসভিত্তিক শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভোলায় একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও সম্প্রসারিত হবে।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতেও আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সেচকাজে ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার ২০২৬-৩০ মেয়াদের জন্য জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।![]()