শিশু-কিশোরদের প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ছোটকাকুকে ঘিরে ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’। আগামী ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ২১১, তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডের আলোকিতে বসবে এই উৎসবের আসর। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণের সুযোগ রেখে সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন। উৎসবে খেলাধুলা, নানা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের পাশাপাশি বড়পর্দায় দেখানো হবে ছোটকাকু সিরিজের বিভিন্ন নাটক। থাকছে গান, অভিনয়, আড্ডা ও আলোচনানির্ভর বিশেষ আয়োজন ‘ছোটকাকু ক্যাফে’।
উৎসব উপলক্ষে শনিবার দুপুর ১২টায় চ্যানেল আইয়ের স্টুডিও বারান্দায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে উৎসবের বিস্তারিত কর্মসূচি ও আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছোটকাকুর স্রষ্টা ও লেখক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর, অভিনেতা ও পরিচালক আফজাল হোসেন এবং ছোটকাকু সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা তারিক আনাম খান।
ছোটকাকু বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি চরিত্র। রহস্য, অভিযান, অনুসন্ধান ও কৌতূহলনির্ভর গল্পের মধ্য দিয়ে চরিত্রটি একাধিক প্রজন্মের পাঠক ও দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফরিদুর রেজা সাগরের সৃষ্ট এই চরিত্রের গল্পে রহস্য সমাধানের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের পর্যবেক্ষণক্ষমতা, অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবোধ ও সচেতনতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
এ পর্যন্ত ছোটকাকুর ৪৮টি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। এসব গল্পের মধ্যে ২৫টি অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে টেলিভিশন সিরিজ। সব মিলিয়ে ছোটকাকু সিরিজের পর্বসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০০। ফলে বইয়ের পাতা পেরিয়ে টেলিভিশনের পর্দায়ও চরিত্রটি দীর্ঘ সময় ধরে শিশু-কিশোরদের বিনোদন দিয়ে আসছে। গল্পের রহস্য ও অভিযানের সঙ্গে দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের বিষয়গুলোও ছোটকাকুর বিভিন্ন অভিযানে উঠে এসেছে।
আয়োজকদের ভাষ্য, ছোটকাকুর গল্প ও অভিযান শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি হয়নি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেশাত্মবোধ, কৌতূহল, সচেতনতা ও বুদ্ধিমত্তার চর্চা বাড়ানো এবং রহস্য সমাধানের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোররা যেন আনন্দের সঙ্গে গল্প, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্যও রয়েছে এ আয়োজনের পেছনে।
দুই দিনের উৎসবকে তাই শুধু একটি বিনোদন আয়োজন হিসেবে না দেখে ছোটকাকুর দীর্ঘ অভিযাত্রাকে উদ্যাপনের একটি মিলনমেলা হিসেবে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উৎসব প্রাঙ্গণে থাকবে বিভিন্ন ধরনের মজার খেলা ও প্রতিযোগিতা। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বড়রাও এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের জন্য থাকছে ল্যাপটপ, ট্যাব, ব্লুটুথ স্পিকারসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পুরস্কার।
উৎসবের পুরো সময়জুড়েই বড়পর্দায় দেখানো হবে ছোটকাকু সিরিজের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর নাটক। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকেরা যেমন ছোটকাকুর অভিযানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে, তেমনি পুরোনো দর্শকেরাও প্রিয় চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে আবারও সময় কাটাতে পারবেন। ছোটকাকুর বিভিন্ন অভিযানের দৃশ্য ও গল্পের ধারাবাহিকতা উৎসবের পরিবেশে একটি আলাদা আবহ তৈরি করবে বলে আয়োজকদের প্রত্যাশা।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘ছোটকাকু ক্যাফে’। দুই দিনে এই আয়োজন সাজানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় ও অতিথিদের নিয়ে। প্রথম দিন ২৮ সেপ্টেম্বর রহস্য, কৌতূহল ও সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাদাত হোসাইন ও মোজাফ্ফর হোসেন। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন অভিনয়শিল্পী ত্রপা মজুমদার, অপি করিম, তাসনিয়া ফারিণ ও কাজী নওশাবা আহমেদ।
লেখক ও অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণে প্রথম দিনের ‘ছোটকাকু ক্যাফে’তে সাহিত্য, রহস্য, অভিনয় ও সৃজনশীলতার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথোপকথন হবে। শিশু-কিশোরদের গল্পের জগৎ কীভাবে তাদের কল্পনাশক্তি ও অনুসন্ধিৎসাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সেসব বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসবে। পাশাপাশি গান ও অভিনয়ের সমন্বয়ে পরিবেশনা করবে সর্বনাম-কুঁড়েঘর। ফলে আলোচনার পাশাপাশি উৎসবের দর্শকদের জন্য থাকবে সরাসরি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
দ্বিতীয় দিন ২৯ সেপ্টেম্বরের ‘ছোটকাকু ক্যাফে’তে থাকবেন ছোটকাকুর স্রষ্টা ফরিদুর রেজা সাগর, অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন এবং ছোটকাকু দলের সদস্যরা। এ পর্বে ছোটকাকুর দীর্ঘ পথচলা, চরিত্রটির সৃষ্টি ও নির্মাণের অভিজ্ঞতা এবং টেলিভিশনে এর অভিযাত্রা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকবে। ছোটকাকুর সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও কলাকুশলীদের অভিজ্ঞতাও উঠে আসবে এ আয়োজনে।
ছোটকাকুর দীর্ঘ যাত্রায় বই ও টেলিভিশন—দুটি মাধ্যমই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবার উৎসবকে সামনে রেখে সেই সাহিত্যভাণ্ডারেও যুক্ত হয়েছে নতুন আয়োজন। নতুন আঙ্গিকে ছোটকাকু সিরিজের ১০টি বাংলা বই প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চারটি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ছোটকাকুর গল্প নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি বাংলা ভাষার বাইরের পাঠকদের কাছেও চরিত্রটির অভিযানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে গোয়েন্দা ও রহস্যনির্ভর গল্পের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তবে ছোটকাকুর গল্পের বিশেষত্ব হলো রহস্য সমাধানের সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা, দেশপ্রেম, কৌতূহল এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধকে যুক্ত করা। কোনো রহস্যের সূত্র খুঁজে বের করা, ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা কিংবা অজানা কোনো জায়গায় অভিযানে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ছোটকাকুর গল্পে শিশুদের চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের জগৎকে প্রসারিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ কারণে ছোটকাকু কেবল একটি কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের শৈশবের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে। বই থেকে টেলিভিশন, আর টেলিভিশন থেকে এখন উৎসবের মঞ্চ—ছোটকাকুর এই দীর্ঘ যাত্রাই এবারের আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, দুই দিনের ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’ নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছোটকাকুকে ঘিরে আগ্রহ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে খেলাধুলা, সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও আলোচনার সমন্বিত আয়োজন শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি করবে আনন্দময় ও সৃজনশীল একটি পরিবেশ। রহস্যের গল্পের মধ্য দিয়ে কৌতূহলী হওয়া, প্রশ্ন করতে শেখা এবং নিজের মতো করে কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজার যে আনন্দ—ছোটকাকু উৎসব সেই অভিজ্ঞতাকেই সামনে আনতে চায়।
২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বরের এই আয়োজন তাই শুধু ছোটকাকুর গল্পের উদ্যাপন নয়; বরং শিশু-কিশোরদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সৃজনশীলতার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি উদ্যোগ। ছোটকাকুর দীর্ঘ অভিযাত্রার সঙ্গে যুক্ত পাঠক ও দর্শকদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদেরও উৎসবে স্বাগত জানাচ্ছেন আয়োজকেরা।![]()