ছোট ঋণেই বড় সংকট, এক বছরে খেলাপি গ্রাহক বেড়েছে প্রায় ২৪ লাখ
দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় ঋণখেলাপিদের নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখন নতুন করে সামনে এসেছে আরও গভীর একটি সংকট। সেটি হলো ছোট ঋণের খেলাপি গ্রাহকের দ্রুত বৃদ্ধি। আগে যেখানে বড় শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়াকে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, এখন সেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতা এবং সিএমএসএমই খাতের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি অর্থনীতির তৃণমূল পর্যায়ের দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ রয়েছে—এমন খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জনে। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নতুন করে প্রায় ২৪ লাখ গ্রাহক খেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি শতভাগেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট ঋণখেলাপির দ্রুত বৃদ্ধি দেশের খুচরা ঋণ ব্যবস্থার গুণগত মানের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। উচ্চমূল্যের ঋণ খেলাপি হলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়, কিন্তু বিপুলসংখ্যক ছোট গ্রাহক খেলাপি হয়ে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য আরও বিস্তৃত ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ এতে শুধু ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতাই কমে না, বরং ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বল অবস্থাও প্রকাশ পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, ক্ষুদ্র ব্যবসার ধীরগতি এবং কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়ার কারণে ছোট ঋণগ্রহীতাদের বড় একটি অংশ কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক পরিবার আগের চেয়ে বেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ঋণ নিয়মিত রাখা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, ছোট ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক হলেও এটি অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে চলমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে। চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা কৃষক—সব শ্রেণির মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে অন্যতম উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
এর মধ্যে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশ খেলাপি। টাকার অঙ্কে খেলাপির হার তুলনামূলক কম হলেও গ্রাহকের সংখ্যার বিচারে পরিস্থিতি ভয়াবহ। কারণ দেশের অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে বড় ঋণেও সংকট কম নয়। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মোট স্থিতি প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এই শ্রেণিতে খেলাপির হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৮ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বড় ঋণখেলাপিদের সংকট যেমন রয়ে গেছে, তেমনি তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছোট ঋণখেলাপির দ্রুত বিস্তার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণেও পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই শ্রেণিতে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা এবং এর মধ্যে সাড়ে ২৬ শতাংশের বেশি খেলাপি। এক বছরে এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ২৫ হাজার ৪৭৭ থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ৫০১ হয়েছে।
১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৬ থেকে বেড়ে ৬ হাজার ১৮৬ জনে পৌঁছেছে। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে প্রায় ৪৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। প্রতিটি শ্রেণিতেই এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। এই খাতের প্রায় ৪৪ শতাংশ ঋণই বর্তমানে খেলাপি। শিল্প খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩২ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সিএমএসএমই খাত। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিতরণ করা ঋণের ৩৪ শতাংশই এখন খেলাপি। এর মধ্যে কুটির শিল্পে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। মাঝারি শিল্পে খেলাপির হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থনীতির কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাতে খেলাপির এমন উচ্চ হার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্মাণ খাতেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ এই খাতে দেওয়া হলেও এর প্রায় ৩০ শতাংশ খেলাপি। একইভাবে কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
তবে ভোক্তা ঋণে তুলনামূলকভাবে খেলাপির হার কম। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশ ভোক্তা ঋণ এবং এই শ্রেণিতে খেলাপির হার প্রায় ৭ শতাংশ।
দেশের সবচেয়ে বড় কৃষিঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তথ্যেও মিশ্র চিত্র দেখা যায়। ব্যাংকটির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা এক বছরে ২৪ লাখ থেকে কমে ২০ লাখে নেমেছে। তবে মোট ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন জানিয়েছেন, অতীতে মওকুফ করা কৃষিঋণের অর্থ সরকার থেকে দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। তবে এবার মওকুফকৃত ঋণের ৬০০ কোটি টাকা ব্যাংক পেয়েছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে শাখাগুলোকে আরও সক্রিয় করা হয়েছে এবং আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেন, আগে বড় ঋণের সমস্যাই বেশি ছিল, কিন্তু এখন কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণও দ্রুত খারাপ হচ্ছে। এ কারণে মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিমালার আওতায় এসব ঋণ পুনঃতফসিল ও নিয়মিত করার চেষ্টা চলছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, এস আলম গ্রুপের ঋণ বাদ দিলে তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার পুরো ব্যাংকিং খাতের তুলনায় কম। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে এবং আদায় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতাও কিছুটা ভিন্ন। সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল মেহেদী জানান, তাদের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এসএমই ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ মাত্র ৯৩ কোটি টাকা। তাঁর মতে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সময়মতো আর্থিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের সুযোগ না দিলে তারা দ্রুত সংকটে পড়ে যান। ফলে সামগ্রিকভাবে ছোট ঋণে খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ঋণখেলাপির এই ঊর্ধ্বগতি শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতির ভোগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় সক্ষমতার ওপর চাপ বৃদ্ধিরও প্রতিফলন। বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণখেলাপি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও এখন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া অর্থনীতির গভীরে ছড়িয়ে পড়া চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা আদায় অভিযান যথেষ্ট হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষি খাতের আয় বাড়ানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপও সমানভাবে প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
![]()