দেশে হৃদরোগের চিকিৎসার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়গুলোও স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জরুরি হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে। এই বাস্তবতা থেকেই ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল কার্ডিয়াক সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী মনে করেন, মানসম্মত চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসক-রোগীর আস্থা এবং পেশাদার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা ও রোগীর সন্তুষ্টিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, তিনটি বিষয়ই পরস্পরের পরিপূরক। তবে অগ্রাধিকারের দিক থেকে রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। একজন রোগী হাসপাতালে এলে সঠিক ও মানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে দ্রুত এবং নিরাপদে সুস্থ করে তোলাই হাসপাতালের প্রধান দায়িত্ব। আর রোগী যখন নিরাপদ পরিবেশে যথাযথ চিকিৎসা ও আন্তরিক সেবা পান, তখনই তার মধ্যে আস্থা ও সন্তুষ্টি তৈরি হয়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ, হাসপাতালের পরিবেশ এবং রোগীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।![]()
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে রোগীদের উদ্বেগের বিষয়টিও সামনে আনেন প্রীতি চক্রবর্তী। তিনি জানান, আধুনিক ও বিশ্বমানের সেবা বজায় রেখেই চিকিৎসার ব্যয় যৌক্তিক ও সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতাল। অসচ্ছল ও প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা তহবিলও রয়েছে। তবে তার মতে, শুধু হাসপাতালভিত্তিক উদ্যোগ দিয়ে চিকিৎসার ব্যয়ের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য দেশে কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে মধ্যবিত্তসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি থেকে আর্থিক সুরক্ষা পেতে পারেন।
চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রীতি চক্রবর্তীর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হলেও চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির সক্ষমতা দেশের ভেতরেই গড়ে তোলা সম্ভব। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের মাধ্যমে চিকিৎসক তৈরি করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ভালো ফল করছে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশোনা করছেন। তাদের অনেকেই নিজ নিজ দেশে লাইসেন্সিং পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হচ্ছেন।
নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রীতি চক্রবর্তী জানান, কাজের অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছেন নার্সিং শিক্ষকদের অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। এ কারণে প্রায় দেড় থেকে দুই বছর ধরে নার্সিং শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স বা টিওটি কার্যক্রম চালু রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিভার্সেল মেডিকেল অ্যান্ড টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে নার্স, চিকিৎসক এবং হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ফার্মেসি, ইমেজিং, ফ্রন্ট ডেস্কসহ বিভিন্ন সাপোর্ট সার্ভিসের কর্মীদেরও রোগীদের সঙ্গে কীভাবে পেশাদার ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তার দাবি, এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম প্রায় এক দশক ধরে চলছে। তবে প্রশিক্ষিত জনবল ধরে রাখা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশে চিকিৎসাসেবা উন্নত হলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এর জন্য শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রযুক্তি বাড়ালেই হবে না; চিকিৎসকদের আচরণ, সেবাদানকারীদের পেশাদারিত্ব এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মানও উন্নত করতে হবে। তার মতে, কভিড-১৯ মহামারির সময় দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে না পারায় অনেক মানুষ দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করেছিলেন। তখন দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। এর ফলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মানুষের একটি নতুন ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে এই আস্থা ধরে রাখতে সমন্বিত নীতির প্রয়োজন রয়েছে। সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ—এই তিন পক্ষকে নিয়ে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রীতি চক্রবর্তী। তার মতে, দেশে কী ধরনের জটিল চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার হচ্ছে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট তথ্য নেই। কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের মতো সেবার পরিধি বাড়ানো, চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।
কার্ডিয়াক বিভাগ চালুর পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি। একদিকে অল্প বয়সী মানুষের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কয়েকটি ঘটনা তাদের নাড়া দেয়। অন্যদিকে হাসপাতালের নিয়মিত রোগীদের কার্ডিয়াক সমস্যা দেখা দিলে তাদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হতো। জরুরি রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান সময় নষ্ট হতো। কখনো কখনো হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটত। এ বাস্তবতা থেকেই নিজেদের একটি কার্ডিয়াক ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
২০১৬ সালে বাংলাদেশের দুজন প্রথিতযশা কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞকে নিয়ে উদ্যোগটি শুরু হয়। তাদের একজন ইন্টারভেনশন এবং অন্যজন কার্ডিয়াক সার্জারি বিশেষজ্ঞ। প্রীতি চক্রবর্তী জানান, এ উদ্যোগের পেছনে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আশীষ চক্রবর্তীর বিশেষ আগ্রহ ও ভূমিকা ছিল।
রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্ডিয়াকসহ ক্রিটিক্যাল কেয়ারের সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। প্রীতি চক্রবর্তীর ভাষায়, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রোগীর চাপের তুলনায় স্পেস সংকট থাকলেও সম্প্রতি প্রায় ২০টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড বাড়ানো হয়েছে। কার্ডিয়াক রোগীরাও এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।
এর পাশাপাশি হাসপাতালের দ্বিতীয় ধাপের সম্প্রসারণের বড় ধরনের নির্মাণকাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর কিছু কার্যক্রম শুরু হতে পারে এবং পরবর্তী ১২ মাসে আরো কিছু সুবিধা চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। সম্প্রসারণের ফলে হাসপাতালের আসনসংখ্যা বাড়বে এবং একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। ইন্টার্নদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভালো ফল ও আগ্রহ দেখানো চিকিৎসকদের ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কার্ডিয়াক ইউনিটে কাজের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। সিনিয়র পর্যায়ের কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়।
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গা হিসেবে প্রীতি চক্রবর্তী পেশাদার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর জোর দেন। রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে আস্থা চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও রোগীদের যথেষ্ট সময় দিয়ে তাদের সমস্যা শোনার আহ্বান জানান তিনি। রোগীর স্বজনদের চিকিৎসকদের ওপর হামলা বা চড়াও হওয়ার ঘটনাকে তিনি অমানবিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্যবীমার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তার মতে, শুধু অনুমোদন পেলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে চিকিৎসাসেবা শুরু করার সুযোগ দেয়া উচিত নয়। একটি হাসপাতালের পর্যাপ্ত অবকাঠামো, জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে রোগীকে শেষ পর্যন্ত আরো ব্যয়বহুল তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে যেতে হয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই তার প্রত্যাশা, যেখানে অর্থের অভাবে কোনো মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত না হন এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে কারও জীবন না হারায়। দেশের মানুষ যেন দেশের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত চিকিৎসা পেতে পারেন—কার্ডিয়াক সেবার সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে দক্ষ জনবল, স্বাস্থ্যবীমা, প্রযুক্তি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা—সব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।![]()