জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে নতুন মার্কিন শুল্ক
রাজু আলীম
দীর্ঘ আইনি লড়াই, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন এক শুল্কব্যবস্থা চালু করল যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত তথাকথিত ‘রেসিপ্রোকাল’ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সেই শুল্ক জাতীয় জরুরি অবস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপ করা হওয়ায় তা নিয়ে আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন উচ্চ আদালত ওই শুল্ক বাতিল করে দেন। আদালতের ওই রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে প্রশ্ন ছিল, কীভাবে একই ধরনের বাণিজ্যিক চাপ অব্যাহত রাখা হবে।
এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আরোপ করা অস্থায়ী ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্কের মেয়াদও শেষ হওয়ার সময় চলে আসে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন আইনি ভিত্তি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বিশ্বের অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হচ্ছে। এই অভিযোগ তদন্ত করে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর)।
সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হয়েছে। খবর রয়টার্স।
ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আগে থেকেই পৃথক শুল্ক কাঠামোর আওতায় থাকা গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য এ ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত পূরণকারী পণ্যও নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন’ শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, উইঘুর সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে চীন অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা পাচ্ছে। যদিও বেইজিং বরাবরের মতোই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে এ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। তদন্তে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, জনমত, লিখিত সাক্ষ্য, সেকশন ৩০১ কমিটি এবং বিভিন্ন উপদেষ্টা কমিটির মতামত বিবেচনা করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের নির্দেশনার ভিত্তিতে এসব তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইউএসটিআর আরও জানিয়েছে, তদন্তে যেসব নীতি, কার্যক্রম ও বাণিজ্যচর্চাকে ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে নির্ধারিত শুল্কহার, শুল্কের আওতা এবং অব্যাহতিগুলো উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে। তবে নোটিশের অ্যানেক্স-১ ও অ্যানেক্স-২-এ কোনো দেশের জন্য আলাদা ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে কেবল এইচটিএসইউএস কোড অনুযায়ী যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে, সেগুলোর তালিকা দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে এবং কঠোরভাবে সেই আইন কার্যকর করছে। এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদাররাও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তার ভাষায়, এ পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিকৃত বাণিজ্যচর্চা সংশোধনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে।
এর আগে গ্রিয়ার জানিয়েছিলেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিতে সর্বোচ্চ শুল্কহার নির্ধারিত রয়েছে, নতুন জোরপূর্বক শ্রম-সংক্রান্ত শুল্ক সেই সীমা অতিক্রম করবে না।
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করছে। নতুন শুল্কের মাধ্যমে সেই বৈষম্য কমানোই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য।
এদিকে নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছে। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে বলেন, নরওয়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের শুল্ক আরোপের কোনো ভিত্তি নেই, কারণ দেশটিতে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে আগে থেকেই কঠোর আইন রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিল এ শুল্ককে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। কানাডা একে একতরফা সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মওরা হিলি বলেছেন, এ ধরনের শুল্ক ব্যবসার ব্যয় বাড়াবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করবে এবং শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক বোঝা ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।
ওয়াশিংটনের বাণিজ্য আইন প্রতিষ্ঠান উইলি রেইনের আইনজীবী টিম ব্রাইটবিলের মতে, নতুন জোরপূর্বক শ্রমভিত্তিক শুল্ক কার্যত শুক্রবার শেষ হওয়া আগের ১০ শতাংশ শুল্ক ব্যবস্থার স্থান দখল করছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ ব্যাখ্যা নাকচ করে বলেন, এটি আগের শুল্কের সরাসরি বিকল্প নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ভিত্তিতে গৃহীত একটি নতুন ব্যবস্থা।
সাবেক মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বর্তমানে বাণিজ্য আইনজীবী রায়ান মেজেরাসের মতে, সেকশন ৩০১ অতীতে আদালতে টিকে যাওয়ায় নতুন এ শুল্ককে আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বাতিল করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ দেশের মোট রপ্তানির সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই খাতের অন্যতম বৃহৎ বাজার। ফলে নতুন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বাংলাদেশের রপ্তানির প্রতিযোগিতা, মূল্য নির্ধারণ এবং মার্কিন বাজারে অবস্থানের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে কোন পণ্য শুল্কের আওতায় পড়ছে, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে ভাগ হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ঢাকা-ওয়াশিংটনের বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব