জ্বালানির দাম ও যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আকাশছোঁয়া উড়োজাহাজ ভাড়া, কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পরিচালন ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে পড়েছে উড়োজাহাজ পরিবহন খাত। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে গত এক বছরে উড়োজাহাজের ভাড়া বেড়েছে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বড় এয়ারলাইনসগুলো বলছে, যাত্রী চাহিদা এখনো শক্তিশালী থাকায় অদূর ভবিষ্যতে ভাড়া কমার সম্ভাবনা খুবই কম। খবর সিএনবিসির।
বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করলে বিমান ভাড়াও কমবে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি ঘটছে না। কারণ শুধু জ্বালানিই নয়, একই সঙ্গে বেড়েছে কর্মীদের বেতন, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিমানবন্দর ব্যবহার ফি এবং অন্যান্য পরিচালন খরচ। ফলে ব্যয় কমলেও তা যাত্রীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
মার্কিন সরকারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে দেশটিতে উড়োজাহাজ ভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বেশি ভাড়া সত্ত্বেও ভ্রমণকারীদের আগ্রহ কমেনি। বরং অধিকাংশ যাত্রী বাড়তি অর্থ দিয়েই ভ্রমণ অব্যাহত রেখেছেন। এ কারণে চলতি বছরের বাকি সময়েও উচ্চ ভাড়ার ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছে বড় এয়ারলাইনসগুলো।
যাত্রীদের আচরণেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক থেকে শিকাগো যেতে মার্জোরি অ্যারান ও তাঁর স্বামী সম্প্রতি দুটি ইকোনমি শ্রেণির টিকিট কিনতে প্রায় ৮০০ ডলার ব্যয় করেছেন। কয়েক বছর আগেও একই রুটে কয়েকশ ডলারেই ভ্রমণ সম্ভব ছিল। ভাড়া বেশি হওয়ায় সফর বাতিলের কথা ভেবেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যারান বলেন, অতিরিক্ত খরচ হলেও তাঁরা ভ্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এয়ারলাইনসগুলোর মতে, বেশির ভাগ যাত্রীর মনোভাবও এখন একই রকম।
এয়ারলাইনসগুলোর ভাষ্য, তাদের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ এখন বহুমাত্রিক। কর্মীদের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিমানবন্দর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানির অস্থিরতা।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী স্কট কিরবি বলেন, শ্রম ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এসব ব্যয় সব এয়ারলাইনসকেই বহন করতে হচ্ছে। ফলে ভাড়া না বাড়িয়ে বিকল্প কোনো পথ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্মীদের বেতনের পর জ্বালানিই এয়ারলাইনসগুলোর সবচেয়ে বড় ব্যয়। চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে জেট ফুয়েলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পুরো শিল্পই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অনেক প্রতিষ্ঠান অলাভজনক বা কম চাহিদাসম্পন্ন রুটে ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। এতে বাজারে আসনসংখ্যা কমে যাওয়ায় ভাড়াও আরও বেড়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি প্ল্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে চার বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর জেট ফুয়েলের দাম কিছুটা কমেছে। তবুও ২৮ ফেব্রুয়ারির তুলনায় দাম এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে এয়ারলাইনসগুলোর আর্থিক ফলাফলেও। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস জানিয়েছে, শুধু জুলাইয়ের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তাদের জ্বালানি ব্যয় অতিরিক্ত ৫৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেড়েছে। এতে কোম্পানিটির তৃতীয় প্রান্তিকের আয়ও চাপে পড়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কিছু প্রতিষ্ঠানকে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপও নিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ গ্যালন জেট ফুয়েল টেক্সাসের হিউস্টন থেকে পানামা খাল হয়ে সমুদ্রপথে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাঠায়। কোম্পানিটির ইতিহাসে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সমুদ্রপথে জেট ফুয়েল পরিবহনের এটিই ছিল প্রথম ঘটনা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলে প্রতি গ্যালন জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৩ ডলার ৬০ সেন্ট। গত এপ্রিলে এই দাম ছিল ৪ ডলার ৭৮ সেন্ট। তবে অঞ্চলভেদে সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে মূল্য এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।
শিল্প সংগঠন এয়ারলাইনস ফর আমেরিকা জানিয়েছে, মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শহরগুলোতে জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। একই সময়ে বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আমালফি জেটসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত শুরু হওয়ার পর চার্টার্ড উড়োজাহাজের ভাড়া গড়ে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, আর কিছু ক্ষেত্রে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের মৌসুম শেষ হওয়ার পর যাত্রী চাহিদা কমে গেলে এয়ারলাইনসগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চাপ ভাড়ার মাধ্যমে বহন করাতে পারবে কি না, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। তবে শক্তিশালী ভ্রমণ চাহিদা, পরিচালন ব্যয়ের উচ্চ চাপ, জ্বালানির অনিশ্চিত বাজার এবং সীমিত প্রতিযোগিতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে উড়োজাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।