জ্বালানি খাতে ‘ধার করা’ নেতৃত্ব, সংকটে সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত যখন গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন খাতটির অন্তত নয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চলছে স্থায়ী প্রধান ছাড়াই। কোথাও অতিরিক্ত দায়িত্ব, কোথাও চলতি দায়িত্ব—এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্রের অন্যতম কৌশলগত এই খাত। ফলে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে গতি হারানোর প্রবণতা।
তথ্য অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো), হাইড্রোকার্বন ইউনিট, বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিপিএমআই), বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি এবং পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানিসহ অন্তত নয়টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়মিত নিয়োগ নেই।
![]()
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত সচিব বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা নিজেদের মূল দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজ সামলাতে গিয়ে সময় ও মনোযোগের সংকটে পড়ছেন। এতে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিলম্ব তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান পদেও বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন একজন অতিরিক্ত সচিব। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পূর্ণকালীন নেতৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু চেয়ারম্যানের অধিকাংশ সময় সচিবালয়ের দায়িত্বে ব্যয় হওয়ায় অনেক ফাইল নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন সংক্রান্ত শুনানিও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি ওজোপাডিকোতেও। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর খুলনায় হলেও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঢাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব সামলান। ফলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।![]()
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদও প্রায় ১৬ মাস ধরে শূন্য। এ সময়ের মধ্যে দুইজন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ক্রমে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ রাজধানীর একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা এ প্রতিষ্ঠানের জন্য পূর্ণকালীন নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা ও জনবল উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটেও একই অবস্থা। শুধু রেক্টর নয়, পরিচালক পর্যায়ের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদই অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, স্থায়ী নিয়োগ না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি এবং পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দীর্ঘদিন ধরে চলতি দায়িত্বে কর্মকর্তারা কাজ করছেন। অর্থাৎ পুরো বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতেই স্থায়ী নেতৃত্বের সংকট একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি খাত। তাই এ খাতের নেতৃত্বে কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বারবার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি কার্যকর জবাবদিহি ও দক্ষ নেতৃত্ব—উভয়কেই দুর্বল করে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, সরবরাহ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এমন সময়ে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব শুধু প্রশাসনিক ধীরগতিই নয়, খাতটির কৌশলগত সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। স্থায়ী ও যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত না হলে সংকট নিরসনের উদ্যোগগুলোও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।