নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। একই সময়ে মোট আমদানির ১৩ শতাংশের বেশি হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সংগ্রহে এসব ব্যাংকের অংশ খুবই কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালের কার্যক্রমের এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের ৭০টি শাখা ও পাঁচটি উপশাখা রয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালনা করছে দুটি বহুজাতিক ব্যাংক—স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ও এইচএসবিসি। অন্য সাতটি ব্যাংক হলো সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক আলফালাহ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে মাত্র ৯১ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তাদের আমানতের অংশও কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানতের বাজারে বিদেশি ব্যাংকের অংশ ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকের আমানতের ধরন অবশ্য দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় আলাদা। দেশীয় ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশ স্থায়ী আমানত। এসব ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৪৮ শতাংশ স্থায়ী আমানত। বিদেশি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ।
অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে। দেশীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের আমানতের হার ২৯ শতাংশ। চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবে সাধারণত সুদের খরচ কম হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের ব্যয়ও তুলনামূলক কম।
বিদেশি ব্যাংকের আমানতে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবের অংশও বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসব ব্যাংকের রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট বা আরএফসিডির অংশ ছিল ১৭ শতাংশ। দেশীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর বেশি নির্ভর করে। ফলে তাদের আমানত সংগ্রহের খরচ কম হওয়ার পাশাপাশি বড় করপোরেট গ্রাহকদের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনায় এসব ব্যাংক সুবিধা পায়।
তবে আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণে ২০২৫ সালে সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশও ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
ঋণ বিতরণ কমলেও শিল্প খাতে বিদেশি ব্যাংকের অর্থায়ন বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শিল্প খাতে তাদের ঋণ ছিল ২২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা হয়েছে। এসব ব্যাংক বিশেষ করে রপ্তানিমুখী উৎপাদনশীল শিল্পে অর্থায়নে বেশি সক্রিয়।
কৃষি ও মৎস্য খাতেও বিদেশি ব্যাংকের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২৬ কোটি টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে বিদেশি ব্যাংকের ঋণ ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের খেলাপি ঋণ বড় প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকটির ৯০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা গেছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে অবশ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান শক্তিশালী। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করা হয়। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৪১২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ ১৮ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
আমদানিতেও তাদের অংশ উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩৮৭ কোটি ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৪২৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশের মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এখন এসব ব্যাংকের মাধ্যমে হচ্ছে।
তবে রেমিট্যান্স সংগ্রহে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা খুবই সীমিত। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে দেশের মোট প্রবাসী আয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে শক্ত অবস্থান এবং কম খরচে আমানত সংগ্রহের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা হয়েছে।
তবে এসব ব্যাংকের মুনাফা ও আয় বিদেশে পাঠানোর পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে মুনাফা ও আয় হিসেবে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল ৫৭৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকটের কারণে আগের সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা ও আয় পুরোপুরি বিদেশে পাঠাতে পারেনি। ২০২৫ সালে আগের মুনাফা ও আয় পাঠানোর ফলে এ অঙ্ক বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে সব বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বাড়েনি। দেশের অর্থনীতিতে ধীরগতি এবং ঋণ ব্যবসায় সংকোচনের প্রভাব পড়েছে কয়েকটি বহুজাতিক ব্যাংকের মুনাফায়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এইচএসবিসির নিট মুনাফা ২৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৮২৩ কোটি টাকা।
কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মুনাফাও কমেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ৬০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৫৭৬ কোটি টাকা।
সিটি ব্যাংক এনএ বাংলাদেশের মুনাফা ২০২৪ সালের ৩৮৪ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩২৮ কোটি টাকা হয়েছে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মুনাফা ২৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ২০৭ কোটি টাকা হয়েছে। হাবিব ব্যাংকের মুনাফা ২৪ কোটি টাকা থেকে কমে ১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিশ্বাস ও সেবার মানের কারণে কম সুদ পেলেও মানুষ বিদেশি ব্যাংকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক সেবা দ্রুত গ্রহণ করায় ভালো করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ব্যাংকের গ্রাহক। ধনী ও উচ্চ আয়ের মানুষও এসব ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখেন।
তিনি বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলো করপোরেট ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি এসএমই ও ক্ষুদ্র খাতেও অর্থায়ন করছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলো ভালো করছে। তাদের কাছ থেকে দেশীয় ব্যাংকগুলো বিভিন্ন সেবা ও ব্যাংকিং সংস্কৃতি গ্রহণ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর শক্তির জায়গা মূলত বৈদেশিক বাণিজ্য, করপোরেট ব্যাংকিং, ট্রেজারি কার্যক্রম ও বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন। দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় তাদের শাখা ও উপশাখা কম হলেও বড় করপোরেট গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারছে।
ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের বাজার অংশ সীমিত হলেও রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। বিশেষ করে রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাদের মাধ্যমে আসায় বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থপ্রবাহে এসব ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।