নিজস্ব প্রতিবেদক
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দেশে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিনিয়োগের জন্য ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং, ই-রেন্টাল সেবা, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতকে অগ্রাধিকার দিতে চান তাঁরা। তবে বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দ্রুত অনুমোদন, বিনিয়োগ সুরক্ষা, জমি বা লিজ সুবিধা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন প্রবাসী উদ্যোক্তারা।
সোমবার রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য ও দাবি তুলে ধরেন সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী এনআরবি সিআইপি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী ব্যবসায়ীরা বলেন, তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান। এ বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবাসী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তাঁরা জানান, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারি অনুমোদন ও বিভিন্ন সংস্থার প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি বা লিজ সুবিধা, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, এরই মধ্যে তাঁরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা, ভিসা জটিলতা এবং দেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আমিরাতপ্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, প্রায় ১২ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ মালিক বা স্পন্সর পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ থাকায় দেশটিতে অনেক বাংলাদেশি কর্মী চাকরি ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এই সুযোগ পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা বাতিলের কারণে দেশে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দ্রুত আমিরাতে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়। বক্তাদের দাবি, ভিসা বাতিল হওয়ায় হাজারো বাংলাদেশি দেশে আটকা পড়েছেন। তাঁদের অনেকের চাকরি, ব্যবসা ও পরিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় দেশে অবস্থান করতে গিয়ে তাঁরা আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে পড়ছেন।
এ অবস্থায় আটকে পড়া প্রবাসীদের একটি তালিকা তৈরি করে আমিরাত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করার আহ্বান জানান তাঁরা। পাশাপাশি দ্রুত তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
প্রবাসীদের সেবা আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগ, ২৪ ঘণ্টার জরুরি হেল্পলাইন চালু এবং ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রস্তাব দেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাসী সহায়তা সেল গঠনেরও দাবি জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভিসা জটিলতা নিরসন, বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, প্রবাসী কার্ড চালু, স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, মৃত প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়ানো, সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং সহজ ঋণ ও বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা।
প্রতিনিধিদলের পক্ষে মোহাম্মদ রুবেল সিআইপি বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী। প্রস্তাবিত ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি রপ্তানি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভিসা জটিলতা এবং দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যার দ্রুত সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।