নিউইয়র্কে ‘দ্বিতীয় আবাসন কর’ নিয়ে বিতর্ক
ভুল নোটিশে ক্ষুব্ধ বহু বাড়ির মালিক, প্রাথমিক বাসস্থান প্রমাণে বাধ্য করছে সিটি প্রশাসন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিতে উচ্চমূল্যের ‘দ্বিতীয় আবাসন’ বা পিয়ে-আ-তের (Pied-à-terre) সম্পত্তির ওপর নতুন কর কার্যকরের উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ধনী ব্যক্তিদের একাধিক বাড়ির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া এই পদক্ষেপে ভুলবশত বহু স্থায়ী বাসিন্দার কাছেও কর-সংক্রান্ত নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাড়ির মালিকরা। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত তথ্য যাচাই না করেই সিটি প্রশাসন নাগরিকদের ওপর নিজেদের বাড়ি যে প্রধান বাসস্থান, তা প্রমাণ করার দায় চাপিয়ে দিয়েছে।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের পার্ক স্লোপ এলাকার বাসিন্দা মারভিন সিপোরেনও এমন একটি নোটিশ পেয়েছেন। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি একই বাড়িতে বসবাস করছেন। সম্প্রতি মেয়র জোহরান মামদানির প্রশাসনের অর্থ বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে তাকে জানানো হয়, তার বাড়িটি নতুন ‘দ্বিতীয় আবাসন কর’-এর আওতায় পড়তে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রমাণ দিতে হবে যে এটি তার স্থায়ী ও প্রধান বাসস্থান।
সিপোরেনের চারতলা বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য ৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি। যদি তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়িটি তার প্রধান আবাসন হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে অতিরিক্ত প্রায় ৪১ হাজার ডলার সম্পত্তি কর দিতে হতে পারে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিপোরেন বলেন, কর বিভাগের নিজেদের নথি থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তিনি সারা বছর ওই ঠিকানাতেই বসবাস করেন। তারপরও তাকে আলাদা করে প্রমাণ দিতে বলা হচ্ছে, যা অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া আর কিছু নয়। তার ভাষায়, প্রশাসন নিজেরা তথ্য যাচাই না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর বাড়তি ঝামেলার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
তবে তিনি নতুন করনীতির বিরোধিতা করেননি। বরং তার মতে, যেসব ধনী ব্যক্তি নিউইয়র্কে বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ি কিনে বছরের অধিকাংশ সময় খালি রাখেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ যৌক্তিক। কিন্তু সেই নীতির বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের স্থায়ী বাসিন্দা ও মধ্যবিত্তদের হয়রানির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
সিটি প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব বাড়ির মালিক এ ধরনের নোটিশ পেয়েছেন, তাদের আগামী ২১ আগস্টের মধ্যে কর অব্যাহতির আবেদন জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিকে করযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
এ বিষয়ে মেয়রের কার্যালয়ের মুখপাত্র মনিকা ক্লেইন জানান, অঙ্গরাজ্যের আইন অনুসারে সম্পত্তির তালিকা প্রকাশের পর সম্ভাব্য করযোগ্য সম্পত্তিগুলো প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে যাদের আপত্তি রয়েছে, তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে পারবেন এবং প্রশাসন সেসব আবেদন পর্যালোচনা করবে।
এদিকে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল বলেছেন, নতুন আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে প্রয়োজনে আইনটি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আইনে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না।
নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই কর কার্যকর হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। সিটির বহু বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতি কমাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিরোধীরা বলছেন, নীতিগতভাবে কর আরোপের উদ্দেশ্য সঠিক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। রিপাবলিকান সিটি কাউন্সিল সদস্য ডেভিড কার অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত মূল্যসীমার অনেক নিচে থাকা সম্পত্তির মালিকদের কাছেও সম্ভাব্য করের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তার মতে, এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং এটি প্রশাসনের অপর্যাপ্ত প্রস্তুতিরই প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, নিউইয়র্কের আবাসন বাজারে উচ্চমূল্যের দ্বিতীয় বাড়ির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সম্পত্তির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নতুন নয়। তবে সঠিক তথ্য যাচাই ছাড়া ব্যাপক হারে নোটিশ পাঠানোর ফলে কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এখন সিটি প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রকৃত দ্বিতীয় আবাসন শনাক্ত করা এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের অযথা হয়রানি থেকে মুক্ত রাখা।