বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। প্রতারণা ও অনিয়মের অভিযোগে ডব্লিউএইচও এবং বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মধ্যে গতকাল তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাঁর পদত্যাগপত্র দেখেছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা ওয়াজেদ। ওই অঞ্চলের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত রয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএইচওর নীতি বাস্তবায়ন অন্যতম।
সায়মা ওয়াজেদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ভারত চলে যান। এরপর সায়মা ওয়াজেদের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন নিয়েও বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে।
ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে প্রথমবারের মতো ছুটিতে পাঠানো হয়। পরে গত বছরের শেষ দিকে তাঁকে অবৈতনিক প্রশাসনিক ছুটিতে রাখা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করে।
এদিকে চলতি বছরের ৩ জুলাই ডব্লিউএইচওকে দেওয়া সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীদের একটি চিঠিতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিস্তারিত জবাব দেওয়া হয়। সেখানে সংস্থাটির পক্ষ থেকে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক প্রতারণা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। সায়মা ওয়াজেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ভ্রমণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, নিয়মিত ভ্রমণ ব্যয় ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বে থাকা একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার বলে তিনি জানান।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকেও অবহিত করেছিলেন বলে জানান।
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ আরও দাবি করেন, বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় ওই জমির অধিকারী হয়েছিলেন।
টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সেবা আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন। তবে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পদত্যাগপত্রে তিনি আরও বলেন, ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে অবৈতনিক ছুটিতে থাকায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব কারণেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান সায়মা ওয়াজেদ।
পদত্যাগের বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ডব্লিউএইচওও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে রয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি সংস্থাটি।
এর আগে দুটি সূত্র জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ডব্লিউএইচও। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ অক্টোবর আঞ্চলিক পরিচালকের পদের জন্য মনোনয়ন ঘোষণা, ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই-বাছাই এবং আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সূত্র দুটি নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকেরা বিশ্ব স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সদস্যরাষ্ট্রগুলো পাঁচ বছর মেয়াদে তাঁদের নির্বাচন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে সায়মা ওয়াজেদের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই দায়িত্বের অবসান হলো।![]()