মো. নুরুল আজীম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি
বিজিবি কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানায় যাত্রা শুরু করলেও সীমান্ত ব্যাংক এখন শুধু একটি বিশেষায়িত গ্রাহকগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসেবে থাকতে চায় না। সাধারণ মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকটি। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বিস্তারের পাশাপাশি ছোট ঋণের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করাও তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘সীমাহীন আস্থা’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা সীমান্ত ব্যাংক এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা, উপশাখা, সার্ভিস সেন্টার ও এটিএমের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর প্রকাশিত ব্যাংকটির কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্রাহকসংখ্যা ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৭১। মোট গ্রাহকের প্রায় ২০ শতাংশ নারী। বিজিবি সদস্যদের জন্য বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে পাঁচটি বিশেষ গ্রাহক প্রাঙ্গণ সেবাও চালু রয়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল আজীম মনে করেন, ব্যাংকিং সেবার প্রকৃত বিস্তার তখনই সম্ভব, যখন রাজধানী ও বড় শহরের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ছোট উদ্যোক্তারাও অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। সে লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ছোট ঋণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সীমান্ত ব্যাংক।
প্রান্তিক অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা বিস্তারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মো. নুরুল আজীম বলেন, সীমান্ত ব্যাংকের অনেক শাখাই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব এলাকার মানুষকে নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ছোট ছোট ঋণের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগগুলোর পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব ঋণের বড় একটি ইতিবাচক দিক হলো—গ্রাহকেরা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন এবং অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকের সহায়তায় ব্যবসার পরিসর বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের এই অবস্থান শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত ব্যাংকের এসএমই বিভাগ থেকে নতুন উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ‘এসএমবিএল আস্থা’, ‘সীমান্ত প্রেরণা’, ‘এসএমবিএল উদ্দীপক’ এবং ‘সীমান্ত ব্যাংক প্রান্তিক উদ্যোগ’-এর মতো পণ্য রয়েছে। ছোট ব্যবসার জন্য ১ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতমুক্ত ঋণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকটির বিশেষ উদ্যোগও রয়েছে। ‘সীমান্ত প্রেরণা’ নামে জামানতবিহীন ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন কৃষিঋণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রযুক্তি ঋণ’ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
প্রান্তিক অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে শাখা স্থাপনকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন নুরুল আজীম। যশোরের গদখালীতে ফুলচাষিদের জন্য ব্যাংকিং সেবা ও ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রত্যন্ত চম্বকনগর এবং কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী প্রাগপুরে শাখা স্থাপন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা হচ্ছে। এতে ব্যাংকের অর্থায়ন শুধু প্রচলিত ব্যবসায়িক কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো আপস করতে চায় না ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা এবং পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত অভ্যন্তরীণ নীতির ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা হয় বলে জানান নুরুল আজীম। ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত তদারকি করা হয়। কোনো গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে দ্রুত যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় দলিল বা ঋণের শর্ত পূরণে ব্যর্থ আবেদনকারীকে ঋণ না দেওয়ার নীতিও অনুসরণ করা হয়।
ব্যাংকটির আর্থিক সূচকেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সীমান্ত ব্যাংকের আমানত ২৯ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে ঋণ ও বিনিয়োগ যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুন শেষে আমানতের পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
প্রযুক্তি এখন সীমান্ত ব্যাংকের সম্প্রসারণ কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই ২০১৭ সালে ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপ ‘কানেক্ট’ চালু করে। বর্তমানে খুচরা গ্রাহকদের জন্য ‘কানেক্ট’ এবং করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ‘কানেক্ট প্লাস’ নামে আলাদা ডিজিটাল সেবা রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, এমএফএসে টাকা পাঠানো, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ডিপিএস ও ফিক্সড ডিপোজিট খোলা, ক্রেডিট কার্ডের বিল এবং টিউশন ফি দেওয়ার মতো সুবিধা রয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকটি। নুরুল আজীমের মতে, সাইবার নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তি বিভাগের বিষয় নয়; এটি গ্রাহকের আস্থা, আমানতকারীর স্বার্থ এবং ব্যাংকের সুশাসনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ ও ব্যাকআপ এবং সম্ভাব্য সাইবার হামলা দ্রুত শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সীমান্ত ব্যাংকের কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপেও প্রযুক্তি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নকে পাশাপাশি রাখতে চায় ব্যবস্থাপনা। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৫০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ৫২৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালন মুনাফা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ার তথ্যও জানানো হয়।
ব্যাংকটির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে সার্বিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি আমানত ও ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড ও বাংলা কিউআর সেবা সম্প্রসারণ এবং ঋণ শ্রেণীকরণ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু ব্যবসার আকার বাড়ানো নয়, সম্পদের মান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চায় সীমান্ত ব্যাংক।
সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি এরই মধ্যে অর্থ ব্যয় করেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সীমান্ত ব্যাংক সিএসআর খাতে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সবুজ অর্থায়নের ওপরও গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
নুরুল আজীমের কাছে সীমান্ত ব্যাংকের আগামী দিনের লক্ষ্য তাই কেবল শাখা বা ঋণের সংখ্যা বাড়ানো নয়। প্রান্তিক মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা, ছোট উদ্যোক্তাকে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া, নারী ও কৃষি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানো এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা সহজ করাই এর মূল লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সীমান্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনায় আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, ঋণশৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
![]()