বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের তথ্য এখন থেকে মাসে মাসে নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এ খাতের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের তথ্য আর তিন মাস পরপর নয়, প্রতি মাসে জমা দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত চিত্র, পরিশোধ সক্ষমতা এবং দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক এবং তাদের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটকে (ওবিইউ) নতুন নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে জারি করা এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ থেকে বেসরকারি খাতের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের তথ্য মাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। জুলাই মাসের তথ্য আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
এতদিন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের তথ্য ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সংগ্রহ করত বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত র্যাশনালাইজড ইনপুট টেমপ্লেট (আরআইটি) পূরণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ই-রিটার্নস পোর্টালে তথ্য জমা দিতে হতো। পাশাপাশি ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের হার্ডকপি, ইডি-১ ও ইডি-২ ফরম এবং ঋণচুক্তির নথিপত্রও জমা দেওয়ার নিয়ম ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রতি মাসের বৈদেশিক ঋণের তথ্য পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হবে। তথ্য জমার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে পাঁচ ধরনের নির্ধারিত আরআইটি পূরণ করতে হবে।
এসব তথ্যের মধ্যে থাকবে ঋণের সাধারণ বিবরণ, কিস্তি বা ধাপভিত্তিক ঋণের তথ্য, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, ঋণসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিস্থিতির প্রক্ষেপণ। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইডি-১ ও ইডি-২ ফরমের হার্ডকপি এবং ঋণচুক্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্য থাকা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ, পরিশোধ সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের জন্য দ্রুত তথ্য পাওয়া প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বৈদেশিক ঋণের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, দেশের লেনদেন ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস), আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অবস্থান এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়নের জন্যই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ দেশের বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ, ডলার সংকট এবং ঋণ পরিশোধের দায় বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত তথ্য পর্যবেক্ষণ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
তারা বলছেন, মাসিক তথ্য সংগ্রহের ফলে কোনো খাতে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ জমা হচ্ছে কি না, ভবিষ্যতে বড় পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের চাপ তৈরি হবে কি না এবং দেশের বৈদেশিক দায় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনার কারণে আগের সার্কুলারগুলোতে থাকা অন্যান্য নিয়ম পরিবর্তন হচ্ছে না। বিদ্যমান সব নির্দেশনাই বহাল থাকবে, শুধু তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা ত্রৈমাসিক থেকে কমিয়ে মাসিক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার মূলত বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অবকাঠামো, উৎপাদনশীল শিল্প এবং বড় প্রকল্পে বেশি। এসব ঋণের প্রবাহ ও পরিশোধ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।