নির্মাণশিল্পের নতুন নকশা: আকাশরেখা থেকে স্মার্ট নগরজীবনের পথে
শাহাদাৎ হোসেন
চেয়ারম্যান, জেমস গ্রুপ
রাজু আলীম
বাংলাদেশের নির্মাণশিল্প আজ এক নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিকাশ এবং ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান সচেতনতা ভবিষ্যতের ভবন ও নগরজীবনের ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। এখন আর শুধু বহুতল ভবন নির্মাণই উন্নয়নের প্রতীক নয়; বরং একটি ভবন কতটা নিরাপদ, টেকসই, কার্যকর ও বাসযোগ্য—সেই প্রশ্নই হয়ে উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি নিয়ে জেমস গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন বলেন, একসময় নির্মাণশিল্পে গতি ও আয়তনকে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় মান, নকশা, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা, জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনাই একটি প্রকল্পের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করছে।
তিনি বলেন, ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর বদলে যাওয়া আকাশরেখা কেবল দৃশ্যমান পরিবর্তন। এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর। আবাসিক টাওয়ার, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স এবং মিশ্র ব্যবহারভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারের পাশাপাশি নির্মাণশিল্প আজ আবাসন অর্থায়ন, সিমেন্ট-স্টিল, স্থাপত্য, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও অসংখ্য সহায়ক শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।![]()
শাহাদাৎ হোসেনের মতে, এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নগরায়ণ। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ফলে আবাসন ও বাণিজ্যিক স্থানের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে শুধু চাহিদা নয়, বদলে যাচ্ছে ক্রেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিও।
তিনি বলেন, একসময় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে লোকেশন ও দামই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এখন মানুষ নির্মাণমান, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, নিরাপত্তা, পার্কিং, যাতায়াত সুবিধা, জায়গার কার্যকর ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এই পরিবর্তিত মানসিকতা ডেভেলপারদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সফল নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে ইট বা কংক্রিট দিয়ে নয়, বরং পরিকল্পনা দিয়ে। জমির উপযোগিতা যাচাই, স্থাপত্য পরিকল্পনা, কাঠামোগত নকশা, ইউটিলিটি সংযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক যোগাযোগ ও পরিবেশগত বিষয়গুলো শুরুতেই সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারলে একটি প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকটাই নিশ্চিত হয়।
তিনি মনে করেন, ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জমির সংকটের কারণে প্রতিটি বর্গফুটের সর্বোচ্চ ব্যবহার জরুরি। তবে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার মানে শুধু বেশি ফ্লোর এরিয়া তৈরি করা নয়। প্রকৃত দক্ষ পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যেখানে বাসিন্দারা পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, খোলা স্থান, চলাচলের সুবিধা এবং আরামদায়ক জীবনযাপনের পরিবেশ পান।
শাহাদাৎ হোসেন বলেন, নকশা পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত পুরো নির্মাণ ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। সঠিক পরিকল্পনা উপকরণ, শ্রম, সময় ও জায়গার অপচয় কমায়। অন্যদিকে দুর্বল পরিকল্পনার কারণে পুনরায় নকশা পরিবর্তন, নির্মাণ বিলম্ব এবং অতিরিক্ত ব্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।![]()
তিনি আরও বলেন, আধুনিক নির্মাণশিল্পে উপকরণের মান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিমেন্ট ও স্টিল ভবনের কাঠামোগত শক্তির ভিত্তি হলেও একটি ভবনের গুণমান শুধু তার কলাম বা বিম দিয়ে বিচার করা যায় না। ইট, টাইলস, সিরামিক, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রঙ, স্যানিটারি সামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ এবং প্লাম্বিং—সবকিছু মিলেই একটি ভবনের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা নির্ধারণ করে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপকরণ নির্বাচনে এখন কেবল প্রাথমিক দাম নয়; বরং স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত মান, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি ভবন নির্মাণের পর প্রথম কয়েক মাস নয়, বরং বহু বছর ব্যবহারের মধ্যেই তার প্রকৃত মান প্রকাশ পায়।
তিনি বলেন, ভালো মানের নির্মাণসামগ্রী ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমায়, ভবনের আয়ুষ্কাল বাড়ায় এবং মালিককে দীর্ঘমেয়াদে অধিক মূল্য প্রদান করে। তাই নির্মাণ ব্যয়ে সামান্য সাশ্রয়ের জন্য নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার শেষ পর্যন্ত বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শাহাদাৎ হোসেনের মতে, স্থাপত্য এখন কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও আরামদায়ক ও কার্যকর করার একটি মাধ্যম। একটি ভবনে কক্ষ, জানালা, বারান্দা ও কমন স্পেসের অবস্থান ঠিক কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করে সেখানে বসবাস কতটা স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা গেলে কৃত্রিম আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যও বাড়ে। একইভাবে টাইলস, সিরামিক, কাচ ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো উপকরণ আজ শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়; এগুলো অভ্যন্তরীণ নকশা ও স্থাপত্যিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আধুনিক রঙ, কোটিং ও স্যানিটারি পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এখন টেকসই ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি, পানি সাশ্রয় এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একটি ভবনের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
শাহাদাৎ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের নির্মাণশিল্প আন্তর্জাতিক প্রবণতা অনুসরণ করলেও দেশের নিজস্ব জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে ভবনের অভিমুখ, ড্রেনেজ, পানি ব্যবস্থাপনা, বায়ু চলাচল ও জ্বালানি দক্ষতা শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন শুধু পরিবেশ রক্ষার স্লোগান নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। ভবন তার পুরো জীবনচক্রে বিপুল পরিমাণ পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করে। আবার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রচুর কাঁচামাল ব্যয় হয় এবং বর্জ্য সৃষ্টি হয়। তাই উন্নত পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল নির্মাণপদ্ধতি পরিবেশের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয়ও হ্রাস করে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টেকসই ভবন নির্মাণ মানেই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ব্যবহার নয়। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রাকৃতিক আলো বাড়ানো, বায়ু চলাচল উন্নত করা, উপকরণের অপচয় কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী পণ্য নির্বাচন—এসবই কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণের বাস্তব উপায়।
প্রযুক্তির প্রসঙ্গ টেনে শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ডিজিটাল ডিজাইন ও বিল্ডিং মডেলিং প্রযুক্তি স্থপতি ও প্রকৌশলীদের আরও নির্ভুলভাবে জটিল প্রকল্প পরিকল্পনার সুযোগ দিচ্ছে। নির্মাণ শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য নকশাগত সংঘাত শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ায় পরবর্তী ব্যয়বহুল পরিবর্তনের ঝুঁকি কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সময়সূচি, নথি সংরক্ষণ, যোগাযোগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলছে। নির্মাণশিল্পে যেখানে সামান্য বিলম্বও প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে, সেখানে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা উৎপাদনশীলতা ও আর্থিক দক্ষতা উভয়ই বৃদ্ধি করছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশন স্বচ্ছতাও বাড়ায়। নিয়মিত প্রকল্প অগ্রগতি, সঠিক নথিপত্র এবং অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান বিনিয়োগকারী, প্রকৌশলী, ডেভেলপার ও ক্রেতার মধ্যে আস্থা তৈরি করে।
শাহাদাৎ হোসেনের মতে, আবাসন অর্থায়নও নির্মাণশিল্পের ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একটি বাড়ি কেনা অধিকাংশ পরিবারের জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ যত বিস্তৃত হবে, তত বেশি মানুষ নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে।![]()
তিনি বলেন, জমি ও নির্মাণ ব্যয় বাড়লেও দায়িত্বশীল ঋণনীতি এবং বাস্তবসম্মত কিস্তি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আবাসন বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকবে। একই সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নির্মাণশিল্পের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই খাত কেবল ডেভেলপার ও ফ্ল্যাট ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় নির্মাণ প্রকল্প সিমেন্ট, স্টিল, ইট, টাইলস, সিরামিক, কাচ, রঙ, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ অসংখ্য শিল্পে চাহিদা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি স্থপতি, প্রকৌশলী, কারিগর, ঠিকাদার, পরিবহনকর্মী ও নির্মাণশ্রমিক—লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে এই খাত সরাসরি যুক্ত।
এই প্রসঙ্গে শাহাদাৎ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পকে একটি বিচ্ছিন্ন ব্যবসা হিসেবে নয়; বরং উৎপাদন, অর্থায়ন, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও নগর উন্নয়নের সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
লেখার উপসংহারে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আগামী দিনের শহর শুধু আরও উঁচু ভবনের মাধ্যমে নয়, বরং আরও উন্নত জীবনমানের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে। নতুন আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও মিশ্র ব্যবহারভিত্তিক উন্নয়ন আগামী কয়েক দশকের নগরচিত্র গড়ে তুলবে। তাই আজকের পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
তিনি মনে করেন, প্রকৌশল ও স্থাপত্য, সাশ্রয়ী ব্যয় ও মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ভবিষ্যতের ভবন শুধু অতিরিক্ত ফ্লোর স্পেস নয়; নিরাপদ, আরামদায়ক, দক্ষ ও অর্থবহ জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। আর প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড হবে ভবনের উচ্চতা নয়, সেই ভবনের ভেতরে মানুষের জীবনের মান।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব![]()