বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বর্তমান ১০ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোমবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। আগামী দিনে বাংলাদেশে বড় পরিসরে মার্কিন বিনিয়োগ আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ সহায়তা করবে—এটাই প্রত্যাশা। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বর্তমানে স্বাভাবিক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যে শুল্ক ছিল, তার সঙ্গে এখন অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হয়েছে। শুল্ক বাড়লে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। এতে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়। তাই বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। বরং আগামী দিনে বাংলাদেশকে আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির রূপান্তরে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও তৈরি হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন বাজারেই তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। এ নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক উচ্চ মূল্য সংযোজনের পণ্য রপ্তানিতে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি চামড়া, পাট, হালকা প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণসহ অন্যান্য খাত থেকেও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও এবার এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ খাতসহ কয়েকটি খাতের জন্য দ্রুতই সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো জনসম্মুখে ঘোষণা করা হবে।
আমদানি পরিস্থিতি নিয়েও তিনি কথা বলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল ও জ্বালানি। অর্থনীতির বিকাশ এবং শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে। ফলে বিকল্প উৎসে বহুমুখীকরণের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিও বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হতে পারে বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে এবং দেশটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে মার্কিন প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি। বর্তমানে মার্কিন বিনিয়োগের বড় অংশ জ্বালানি খাতনির্ভর হলেও ভবিষ্যতে এটি আরও অনেক খাতে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বিনিয়োগ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে মার্কিন বিনিয়োগ শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে এ বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, একদিকে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়বে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বর্তমান ১০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি হবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ভোক্তা বাজারকে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশটির ভোক্তাদের রুচি ও পছন্দ বিবেচনায় নিয়ে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে হবে। কারণ বিভিন্ন দেশের ভোক্তাদের চাহিদা ও পছন্দে পার্থক্য রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর একটি এবং দেশটির অর্থনীতির আকার প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রযুক্তি খাতেও দেশটি অত্যন্ত অগ্রসর। তাই এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশ যে পণ্যগুলো রপ্তানি করে, সেগুলোর পরিমাণ সামান্য বাড়ানো গেলেও তা দেশের মোট রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, মার্কিন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আগামী দিনে নতুন মাত্রা পেতে পারে।