‘ককরোচ’দের আন্দোলনে টালমাটাল মোদির গদি
রাজু আলীম
প্রধান সম্পাদক, ইউএসএ বাংলা নিউজ
![]()
ভারতের রাজনীতিতে বড় বড় আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন কিংবা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ঘিরে বিক্ষোভ—সবই নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে নেই কোনো বড় রাজনৈতিক দল, নেই প্রতিষ্ঠিত কোনো ছাত্রসংগঠনও। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেওয়া ব্যঙ্গাত্মক একটি প্ল্যাটফর্ম—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)—আজ ভারতের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী এবং তরুণদের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন সরাসরি মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দিল্লি থেকে মুম্বাই, কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু—দেশজুড়ে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমেছেন। আন্দোলনের দাবিও আর কেবল একটি পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন শিক্ষা ব্যবস্থা, বেকারত্ব, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।
![]()
‘ককরোচ’ নামটি যেভাবে আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হলো
আন্দোলনের নামের পেছনের গল্পটিও ব্যতিক্রমী। সরকারি নীতির সমালোচনা করা বেকার ও ক্ষুব্ধ তরুণদের নিয়ে এক বিতর্কিত মন্তব্যে তাদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল অপমান করা। কিন্তু তরুণরা সেই অপমানকেই প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেন। ‘আমাদের যদি ককরোচ ভাবা হয়, তাহলে আমরা সেই পরিচয় নিয়েই লড়ব’—এই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এরপর ‘Cockroach Janta Party’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট, ভিডিও ও রাজনৈতিক কার্টুনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তব আন্দোলনে পরিণত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই লাখো অনুসারী যুক্ত হয় প্ল্যাটফর্মটিতে।
![]()
প্রশ্নফাঁস থেকে জাতীয় আন্দোলন
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। লাখ লাখ পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেন, প্রশ্নপত্র আগেই বিভিন্ন চক্রের হাতে পৌঁছে যায় এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি করা হয়। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হন।
সরকার প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু তদন্তের গতি ও সরকারের অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ আরও বাড়তে থাকে।
ক্রমে প্রশ্নফাঁসের ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কয়েকটি বিষয়, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘসূত্রতা; নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পুলিশি দমন-পীড়ন এবং সরকারের জবাবদিহির অভাব। ফলে একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত আন্দোলন অল্প সময়েই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে।
![]()
সরকারের সঙ্গে সংঘাত
গত সপ্তাহে দিল্লির যন্তর মন্তরে লাখো শিক্ষার্থীর সমাবেশের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। আন্দোলনকারীরা সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দিলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ এবং শতাধিক আন্দোলনকারীকে আটক করার ঘটনা ঘটে।
এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #CockroachRevolution এবং #JusticeForStudents হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করতে শুরু করে।
আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার তাদের কণ্ঠ দমিয়ে রাখতে পুলিশকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সোনম ওয়াংচুকের যোগদান
আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। তিনি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ২৬ দিনের অনশন শুরু করেন।
তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আশ্বাস দেওয়ার পর তিনি অনশন ভাঙেন। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অনশন শেষ হলেও আন্দোলন শেষ নয়।
মোদি সরকারের ওপর চাপ কেন বাড়ছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ভিত্তি।
২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম বড় শক্তি ছিল তরুণ ভোটার। কিন্তু এখন সেই তরুণদের একটি বড় অংশই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রচলিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নেই। ফলে এটিকে সহজে ‘বিরোধীদের ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিরোধী দল কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও বাম দলগুলো আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও নেতৃত্ব পুরোপুরি শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের হাতে রয়েছে।
সরকারের অবস্থান
চাপ বাড়তে থাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন, বিশেষ আদালত গঠন এবং পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি।
আজকের সর্বশেষ পরিস্থিতি
শুক্রবার (২৪ জুলাই) আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে আরও সময় চেয়েছে।
তবে ককরোচ জনতা পার্টি জানিয়ে দিয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে না।
আজ দেশজুড়ে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট, ওয়ান ডিমান্ড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলা শহরে বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং স্মারকলিপি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দিল্লি, মুম্বাই, পুনে, হায়দরাবাদ, কলকাতা, পাটনা ও লখনউসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।
এদিকে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দাবি করেছেন, তাদের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি চলছে। যদিও সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
ভারতের রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলন নতুন নয়। তবে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে এর সাংগঠনিক ধরন। এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়, তবু দেশজুড়ে সমন্বিত কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এর অর্থায়ন হচ্ছে ছোট ছোট অনুদানের মাধ্যমে, আর সংগঠনের মূল শক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার যদি কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আবার দাবি মেনে নিলে তা সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতার বার্তা দিতে পারে।
এই কারণেই ‘ককরোচ’দের আন্দোলন এখন আর কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়; এটি মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার কি আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করবে, নাকি এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে।