বাব আল-মান্দাব ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচল সুরক্ষায় ১৪ দেশের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; হুতি হুমকির প্রেক্ষাপটে উদ্যোগ
লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে নতুন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠিত হয়েছে। ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে গঠিত এ জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই জোটে প্রাথমিকভাবে ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষে নতুন এ জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ, আনাদুলু এবং আল জাজিরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
যৌথ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, জোটটির মূল উদ্দেশ্য হবে বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি পরিবহন নিরাপদ রাখা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করা। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই জোট সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, সামরিক জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে গঠন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কনভেনশন এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই জোটটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
নতুন জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবকে মনোনীত করা হয়েছে। দেশটির রাজধানী রিয়াদেই স্থাপন করা হবে জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর, যৌথ অভিযান সমন্বয় কেন্দ্র, যৌথ সামুদ্রিক অপারেশন সেন্টার এবং সচিবালয়।
জোটের আওতায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমন্বিত টহল এবং ভবিষ্যৎ যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনার কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এছাড়া সম্ভাব্য সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও চালু করা হবে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাশাপাশি জোটের সাংগঠনিক কাঠামো, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের কার্যক্রম শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী ১৪টি দেশ হলো—সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, কোমোরোস এবং সুদান।
তবে একই ধরনের নিরাপত্তা স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এই জোটে যোগ দেয়নি বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। সৌদি আরব জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও জোটে যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।
এদিকে নতুন এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
![]()
কেন এই জোট গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলো নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগরের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে চলে আসে।
একই সময়ে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগরের বিকল্প রুটের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। এর ফলে এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার হওয়ায় সেখানে দুটি নৌচ্যানেলের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল করে। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত, হামলা বা অবরোধ সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানির মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন এই সামুদ্রিক জোট লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান নৌ নিরাপত্তা মিশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক উদ্যোগের সঙ্গে এই জোটের সমন্বয় কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।