দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়নের পর বাংলাদেশের টাকা এখন শক্তিশালী হওয়ার ধারায় ফিরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে টাকার মূল্যমান পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ০ দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ৩০ আগস্ট প্রতি ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য বেড়েছে ০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের পর এ পরিবর্তনকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবশ্য চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। এ সময়ে এক ডলারের বিপরীতে টাকার দর ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠে। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমেছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা বা ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি ও পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে চাপ এ অবমূল্যায়নকে তীব্র করে।
এখন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সেই চাপ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭ দশমিক ৭০২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
ডলারের সরবরাহ বাড়ার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাজার পরিস্থিতি যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার ছয়টি ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে। বিক্রির দর ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সার মধ্যে, গড় দর ১২৩ টাকা ২২ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে অতিরিক্ত ডলারচাহিদা আছে কি না, তা যাচাই করতেই এ নিলাম করা হয়; বরাদ্দ করা ২ কোটি ডলারের পুরোটিও ব্যাংকগুলো নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট রেফারেন্স রেটেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ডলারের দর কিছুটা নিচে নামার প্রবণতা দেখা যায়। ১৫ সেপ্টেম্বর দিনের শেষের রেফারেন্স রেট ছিল ১২৩ টাকা ২৫৮৯ পয়সা, ১৭ সেপ্টেম্বর তা ১২৩ টাকা ০০৭৮ পয়সায় নেমে আসে। ২১ সেপ্টেম্বর দিনের শেষের হার ছিল ১২২ টাকা ৯৯৫১ পয়সা।
আঞ্চলিক মুদ্রাবাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের তুলনামূলক হিসাবে, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুনে ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহও প্রায় ৯ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। বিপরীতে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মূল্য বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানি রুপির মূল্য বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।
টাকার এই সাম্প্রতিক শক্তিশালী অবস্থানের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হলে একই পরিমাণ ডলার দিয়ে আমদানি করা পণ্য কিনতে তুলনামূলক কম টাকা প্রয়োজন হয়। এতে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ডলারে পরিশোধযোগ্য বৈদেশিক ঋণের টাকার হিসাবে দায়ও কিছুটা কমে।
তবে টাকার শক্তিশালী হওয়াকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করার আগে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, আমদানি চাহিদা, রিজার্ভ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজার-হস্তক্ষেপ—সবগুলো সূচকের গতিপ্রকৃতি দেখতে হবে। সাম্প্রতিক তথ্য অবশ্য বলছে, ডলারের সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে টাকার ওপর দীর্ঘদিনের চাপ আপাতত অনেকটাই কমেছে।![]()