জ্বালানি তেলের বাজারে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হলেও সরকারের লোকসান পুরোপুরি কাটছে না বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাঁর হিসাবে, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের ঘাটতি থাকছে প্রায় ৭০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় নিয়ে এসব কথা বলেন রিজভী। এর আগে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, দাম সমন্বয়ের আগে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। নতুন সিদ্ধান্তে তা ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে প্রায় ২০৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। সেই হিসাব ধরলে আগের বিক্রয়মূল্যে প্রতি লিটারে সরকারের ঘাটতি ছিল প্রায় ৯০ টাকা। দাম বাড়ানোর পর ঘাটতি কমে প্রায় ৭০ টাকায় নামবে।
অর্থাৎ, ভোক্তার ওপর বাড়তি ২০ টাকার চাপ গেলেও আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্য ও অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হচ্ছে না। রিজভীর ভাষায়, এই ব্যবধান শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকি বা আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে সামাল দিতে হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
জ্বালানি তেলের বাজারে বাংলাদেশের ওপর চাপের মাত্রা বোঝাতে দেশের মোট ব্যবহার নিয়েও কথা বলেন রিজভী। তাঁর দেওয়া হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ডিজেলের ব্যবহার প্রায় ৪৫ লাখ টন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খাত নয়, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পণ্য পরিবহনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে এর প্রভাব পড়ার সুযোগ থাকে।
রিজভী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেই জ্বালানি কিনতে হয়। তাই বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে তা পুরোপুরি অপরিবর্তিত রাখা সরকারের জন্য কঠিন। তবে দাম সমন্বয়ের পরও যখন বড় অঙ্কের লোকসান থাকছে, তখন ভর্তুকির চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার কথাও বলেন রিজভী। তাঁর বক্তব্য, যারা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন, তাদেরও কম দামে কীভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব, সেই পথ দেখাতে হবে। শুধু মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা করলে হবে না; আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয় বিবেচনায় রেখে বিকল্প উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার কথাও বলতে হবে।
বিভিন্ন দেশ থেকে গ্যাস ও জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে বলেও জানান বিএনপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘ হলে নির্দিষ্ট একটি উৎস বা সরবরাহপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকি বাড়াতে পারে—রিজভীর বক্তব্যের মধ্যে সেই উদ্বেগও প্রতিফলিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সাম্প্রতিক সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও তোলেন রিজভী। এসব ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে একটি মহল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করেন রিজভী। প্রশাসনের ভেতরে আগের সরকারের সহযোগীদের একটি অংশ নাশকতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। এগুলো তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ ও দাবি; স্বাধীনভাবে সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য ওই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি। citeturn0search3
রাজনৈতিক কর্মসূচির কথাও জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলো সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি তাই শুধু পাম্পে ভোক্তার খরচ বাড়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়মূল্য, সরকারের ভর্তুকির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রায় জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং পরিবহন ও উৎপাদন খরচ—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। রিজভীর দেওয়া হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলে ৭০ টাকা ঘাটতি থাকলে বড় পরিমাণে ব্যবহৃত এ জ্বালানি সরকারের অর্থব্যয়ের ওপরও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকৃত ভর্তুকি বা লোকসানের পরিমাণ নির্ধারণে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, পরিবহন ব্যয়, পরিশোধন ও বিপণন ব্যয়সহ পুরো মূল্য কাঠামো বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমান বিতর্কের মূল জায়গা সেখানেই—আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় কতটা ভোক্তার ওপর দেওয়া হবে এবং কতটা সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে বহন করতে হবে। একদিকে কম দাম ধরে রাখলে সরকারি আর্থিক চাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে দাম বাড়ালে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে তার প্রভাব অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সঙ্গে সরকারি ভর্তুকি, সরবরাহ নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
![]()