হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দ্রুত বাড়লেও বাস্তব বাজার এখনো সেই গতিতে এগোয়নি। মানুষের মতো দেখতে ও মানুষের তৈরি পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম এসব রোবট নিয়ে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও নানা প্রদর্শনীতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শন চলছে। কিন্তু শিল্প ও পেশাদার সেবা খাতে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক রোবোটিকস ফেডারেশনের (আইএফআর) হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত বছরে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের রোবট বিক্রি হয়েছে মাত্র প্রায় ৭ হাজার।
হিউম্যানয়েড রোবটের বাজার সম্পর্কে প্রথমবারের মতো পৃথক বিক্রয় তথ্য প্রকাশ করেছে আইএফআর। প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বব্যাপী রোবোটিকস খাতের তথ্য সংগ্রহ করছে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক এ সংস্থা। এতদিন সাধারণ শিল্প ও সার্ভিস রোবটের সঙ্গে হিউম্যানয়েড রোবটের তথ্যও একই শ্রেণীতে বিবেচনা করা হতো। নতুন তথ্য থেকে এ প্রযুক্তির বর্তমান বাণিজ্যিক পরিসর সম্পর্কে তুলনামূলক স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
আইএফআরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো রোবটকে হিউম্যানয়েড হিসেবে বিবেচনা করতে হলে তার কাঠামো মানুষের মতো হতে হবে এবং মানুষের তৈরি পরিবেশে স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তবে মানুষের মতো দুটি পা থাকা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ শুধু আকৃতি নয়, মানুষের জন্য তৈরি কর্মপরিবেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার সক্ষমতাও এ শ্রেণীবিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
বর্তমান রোবট বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে হিউম্যানয়েডের বিক্রির পরিমাণ যে কতটা ছোট, তা আইএফআরের অন্যান্য তথ্যেও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে কারখানায় প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার শিল্প রোবট স্থাপন করা হয়। একই সময়ে পরিবহন, আতিথেয়তা ও পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বিক্রি হয় প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার সার্ভিস রোবট। সেই তুলনায় ৭ হাজার হিউম্যানয়েড রোবটের বিক্রি এখনো একটি অত্যন্ত ছোট বাজারকেই নির্দেশ করে।
আইএফআরের সাধারণ সম্পাদক সুসান বিয়েলার জানান, বিক্রি হওয়া হিউম্যানয়েড রোবটের বড় অংশ এখনো সরাসরি উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নকারী কোম্পানিগুলো এসব রোবটের অন্যতম ক্রেতা। নতুন এআই মডেল উন্নয়নের জন্য বাস্তব জগতের তথ্য ও প্রশিক্ষণ ডেটা তৈরিতেও এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান বিক্রির পরিমাণ দিয়ে ভবিষ্যৎ বাজারের আকার বোঝা কঠিন। ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে হিউম্যানয়েড রোবটের সরবরাহ প্রায় ৯০ হাজারে উঠতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক সরবরাহ ১২ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ গবেষণা ও পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর্যায় থেকে উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রযুক্তিটি দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে এ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাস্তবায়নে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রোবটের উৎপাদন ব্যয় কমানো, নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, মানুষের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতা এবং বাস্তব শিল্পপ্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বিক্রি হওয়া রোবটের উল্লেখযোগ্য অংশ যখন গবেষণা ও এআই উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন বৃহৎ পরিসরে শিল্প উৎপাদনে এর ব্যবহার কত দ্রুত বাড়বে সেটিই হবে এ বাজারের পরবর্তী পরীক্ষার বিষয়।
আইএফআরের হিসাবেও সামরিক, গৃহস্থালি ও চিকিৎসা খাতের রোবট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চিকিৎসায় ব্যবহৃত রোবটকে পৃথক শ্রেণীতে বিবেচনা করা হয়। ফলে ৭ হাজার ইউনিটের হিসাবটি হিউম্যানয়েড রোবটের পুরো সম্ভাব্য বাজার নয়; বরং শিল্প ও পেশাদার সেবা খাতে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে দৃশ্যমান বাজারের একটি নির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরে।![]()