রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ফু-ওয়াং ক্লাবকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি কখনো মদ-বিয়ার বিক্রি, কখনো অবৈধ মজুদ, আবার কখনো ক্যাসিনো কার্যক্রমের অভিযোগে সংবাদে এসেছে। ২০১৯ সালে একই প্রতিষ্ঠানে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পুলিশ ও র্যাবের অভিযানের ফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। পুলিশের অভিযানে অবৈধ কিছু না পাওয়ার দাবি করা হলেও পরবর্তী র্যাব অভিযানে দুই হাজারের বেশি বিদেশি মদের বোতল, ১০ হাজারের বেশি বিয়ার ক্যান এবং নগদ ৭ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা জানানো হয়। সেই অভিযানে ক্লাবটি সিলগালা করা হয় এবং মালিক শেখ নূরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের জন্য খোঁজা হচ্ছিল বলে র্যাব জানিয়েছিল।
বছর পেরিয়ে সেই শেখ নূরুল ইসলাম আবার আলোচনায় এসেছেন ভিন্ন পরিচয়ে—জনপ্রিয় ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর হিসেবে। সালমান ও দিশা ইসলামের বিয়ে হয় ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিশা ইসলামের এটি দ্বিতীয় বিয়ে এবং তাঁর আগের সংসারের দুই সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর সালমান নিজেই তাঁদের নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং দিশার সঙ্গে সম্পর্ক ও বিয়ের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ভালোবাসার বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু নূরুল ইসলামকে ঘিরে অতীতের নথিভুক্ত ঘটনাগুলো এবং সাম্প্রতিক সময়ে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) চিঠি—এই দুই বিষয়কে পাশাপাশি রাখলে কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে নূরুল ইসলামের ব্যবসা, তাঁর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, মদ আমদানি ও মজুদের হিসাব, কর-শুল্ক পরিশোধ এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক সম্পদের প্রকৃত কাঠামো নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানের সূচনা
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে। চিঠিতে তাঁর নামে থাকা হিসাবের অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্ম, KYC তথ্য, লেনদেনের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তাও চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালমানের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে BFIU এই তথ্য চেয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে একজন BFIU কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এ ধরনের তথ্য চাওয়া অর্থপাচার বা অপরাধের প্রমাণ নয়; সংস্থাটি বিভিন্ন অনুসন্ধানে নিয়মিত এ ধরনের তথ্য চেয়ে থাকে। একই সময়ে BFIU কেন সালমানের হিসাব চেয়েছে, তার নির্দিষ্ট কারণও প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
এই চিঠির সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের Brown Fish Studio-তে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার পর সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলেছিলেন; পরে পুলিশ ওই ঘটনার সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্রের কথা জানিয়েছে।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। একদিকে রয়েছে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার ঘটনা; অন্যদিকে রয়েছে তাঁর শ্বশুর শেখ নূরুল ইসলাম ও ফু-ওয়াং ক্লাবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিতর্ক। একটি থেকে অন্যটির সঙ্গে সরাসরি অপরাধমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
ফু-ওয়াং ক্লাবের পুরনো অধ্যায়
শেখ নূরুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে নথিভুক্ত তথ্যগুলোর একটি হলো ফু-ওয়াং ক্লাবের ২০১৯ সালের অভিযান।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ র্যাবের দীর্ঘ অভিযানের পর ক্লাবটি সিলগালা করা হয়। র্যাব জানায়, সেখানে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি বিদেশি মদ ও বিয়ার মজুত ছিল এবং কিছু মদের ব্র্যান্ডের অনুমোদনও ছিল না। অভিযানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বোতল বিদেশি মদ, ১০ হাজার ক্যান বিয়ার, বিদেশি সিগারেট এবং ৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। তিন কর্মচারীকে আটক করা হলেও মালিক শেখ নূরুল ইসলামকে তখন পাওয়া যায়নি।
ইত্তেফাকের সে সময়ের প্রতিবেদনে র্যাবের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছিল, ক্লাবের মজুদ বইয়ে যে পরিমাণ মদ-বিয়ার থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি পণ্য পাওয়া যায়। র্যাব মালিক শেখ নূরুল ইসলামকে মামলার প্রধান আসামি করার কথাও জানিয়েছিল।
আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, এর মাত্র দুই দিন আগে পুলিশ ওই ক্লাবে অভিযান চালিয়েছিল। তখন অবৈধ জুয়া বা মদের বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পরবর্তী র্যাব অভিযানে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন মদ-বিয়ার উদ্ধারের পর দুই অভিযানের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে নূরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও নানা অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ‘যোগাযোগ’, ‘প্রভাব’ বা ‘আত্মীয়তা’ সম্পর্কিত দাবিগুলোকে আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখা যায় না। সেগুলো তৎকালীন সংবাদসূত্রে প্রকাশিত অভিযোগ বা গোয়েন্দা-সূত্রনির্ভর বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০০৯ সালের অনুসন্ধানেও মদ-বিয়ার ব্যবসার প্রশ্ন
ফু-ওয়াংকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য ২০১৯ সালে শুরু হয়নি। ২০০৯ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অনলাইন আর্কাইভে ফু-ওয়াং ক্লাবের মদ-বিয়ার ব্যবসা, বার লাইসেন্সের শর্ত, অনুমোদিত উৎসের বাইরে মদ সংগ্রহ এবং ক্লাবে ডিসকো আয়োজনের বিষয়ে নানা অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ক্লাবের মদ-বিয়ার সরবরাহের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ছিল এবং লাইসেন্সের শর্তের সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের অসামঞ্জস্যের অভিযোগও ছিল।
তৎকালীন প্রতিবেদনে নূরুল ইসলামের ব্যবসায়িক সম্পদ ও মদ-বিয়ার ব্যবসার অর্থের উৎস নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১৭ বছর আগের এসব সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগের কোনোটিকে বর্তমান সময়ের প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের সিদ্ধান্ত, কর নথি এবং সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানেই বর্তমান অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
মদ-বিয়ার ব্যবসার অর্থনীতি কোথায়?
বাংলাদেশে মদ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পণ্য। আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রয়োজন। ফলে কোনো ব্যবসায়ীর প্রকৃত ব্যবসার পরিমাণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু বার বা ক্লাবের বিক্রির হিসাব যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে আমদানির কাগজ, শুল্ক পরিশোধ, গুদামজাত পণ্যের হিসাব, বিক্রির রেকর্ড, বারভিত্তিক মজুদ, ব্যাংক লেনদেন এবং আয়কর ও ভ্যাটের তথ্য।
ফু-ওয়াংয়ের ২০১৯ সালের ঘটনাটি এই প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদিত মজুদের তুলনায় বেশি মদ-বিয়ার পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ অন্তত ওই অভিযানের সময় মজুদ ও অনুমোদনের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল।
এখন যদি নূরুল ইসলামের মালিকানাধীন বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠান, গুদাম কিংবা বার থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কোন প্রতিষ্ঠান কোন লাইসেন্সে চলছে, কত পরিমাণ পণ্য আমদানি করছে, কত শুল্ক-কর দিচ্ছে এবং বিক্রির পরিমাণ কত—এসব তথ্য একত্র করলে ব্যবসার প্রকৃত আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। নূরুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি সম্পদ বিবরণী, আদালতের নথি, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে সিস্টেমের বাইরে ঘোরে—এ দাবিরও প্রকাশ্য নিরীক্ষিত বা সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব সংখ্যা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা সমীচীন হবে না।
সালমান-দিশার বিয়ে এবং উত্তরাধিকার প্রশ্ন
সালমান মুক্তাদির ও দিশা ইসলামের বিয়ের তথ্য প্রকাশ্য। ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সালমান গণমাধ্যমকে জানান, দিশার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পেছনে ব্যক্তিগত আবেগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিয়ে নিয়ে পরবর্তী সময়ে যে ধরনের আলোচনা হয়েছে, তার একটি অংশ দিশার পারিবারিক সম্পদ ও উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে। দিশা নূরুল ইসলামের মেয়ে এবং তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকা পাবেন—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রকাশ্য উইল, উত্তরাধিকার নথি, সম্পদ বিবরণী বা কোম্পানি শেয়ারহোল্ডিং রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
অতএব সালমান মুক্তাদির দিশাকে বিয়ে করেছেন ভবিষ্যতে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
এমনকি দিশার আগের সংসার, তাঁর দুই সন্তান কিংবা তাঁর প্রথম স্বামীর জাতীয়তা সম্পর্কেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি রয়েছে। প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সংবাদে দিশার দুই সন্তানের কথা পাওয়া গেলেও তাঁদের ‘শ্রীলঙ্কান’ পরিচয় কিংবা তাঁর আগের স্বামীর জাতীয়তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব ব্যক্তিগত তথ্যকে অনুসন্ধানের মূল অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করারও যথেষ্ট সাংবাদিকতাগত ভিত্তি নেই।
আত্মীয়তার অভিযোগ কতটা যাচাই করা গেছে?
নূরুল ইসলাম ও শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের আত্মীয়তার বিষয়টিও এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কিছু পুরনো সংবাদ প্রতিবেদনে নূরুল ইসলামকে একজন পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর আত্মীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ‘সুইডেন আসলামের আপন ভগ্নিপতি’—অর্থাৎ তাঁর বোনকে নূরুল ইসলাম বিয়ে করেছেন—এই নির্দিষ্ট সম্পর্কের বিষয়ে সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য স্বাধীন উৎস পাওয়া যায়নি। ফলে এই সম্পর্ককে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা উচিত নয়। বরং অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জন্মনিবন্ধন, বিবাহের নথি, পারিবারিক পরিচয় এবং পুরনো মামলা-সংক্রান্ত নথি দিয়ে সম্পর্কটি যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
নূরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ আমলে প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন—এমন অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। পুরনো সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর পুলিশ ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি প্রকাশিত হয়েছিল।
কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা প্রশাসনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ দেওয়ার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের উৎস, কল রেকর্ড, সাক্ষ্য, মামলার নথি অথবা তদন্ত সংস্থার নথি প্রয়োজন। একইভাবে ‘জামায়াতের ব্যাকআপে ব্যবসা চলছে’ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে কোটি টাকা দিয়ে পদে বসানো হয়েছে—এমন অভিযোগও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য উৎসে যাচাই করা যায়নি।
বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের বিরুদ্ধে ৩০ কোটি টাকা দিয়ে পদ কেনার অভিযোগের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, হাসান মারুফ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং তিনি ৪ মার্চ ২০২৫ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
তাঁর বিরুদ্ধে নূরুল ইসলামের কাছ থেকে মাসে ৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়—এমন দাবিরও কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি প্রতিবেদনে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে লেখা যাবে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভূমিকা
মদ আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রির মতো নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মহাপরিচালকই এর প্রধান এবং প্রতিষ্ঠানটি মাদক-সংক্রান্ত সরকারি নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।
বর্তমানে হাসান মারুফ মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন। সরকারি জীবনবৃত্তান্তে তাঁর আগের দায়িত্বগুলোরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া রয়েছে।
সুতরাং নূরুল ইসলামের ব্যবসার বিরুদ্ধে যদি বর্তমানে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তার সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হতে পারে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স, আমদানি নথি, গুদাম মজুদ, বিক্রির রেকর্ড এবং কর-শুল্কের হিসাবের সমন্বিত অডিট।
BFIU-এর নতুন অনুসন্ধান কেন গুরুত্বপূর্ণ
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব চাওয়ার ঘটনাটি এই জায়গায় একটি আলাদা প্রশ্ন তৈরি করেছে। BFIU দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করে। ২০২৬ সালে সংস্থাটির প্রধান হিসেবে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন দায়িত্ব পালন করছেন।
৩০ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে সালমানের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, KYC এবং লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন চাওয়া হয়েছে, সেটি এখনো প্রকাশ্যে পরিষ্কার নয়। BFIU-ও কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ করেনি।
তাই এখান থেকে সালমান মুক্তাদিরকে মাদক ব্যবসায়ী, অর্থপাচারকারী কিংবা কোনো অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য বর্তমানে নেই।
বরং অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিত—BFIU ঠিক কোন ঝুঁকি বা লেনদেনের কারণে তাঁর হিসাব চেয়েছে? তাঁর কোনো কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন আছে কি না? তাঁর ব্যাংকিং লেনদেনের সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার কোনো আর্থিক যোগসূত্র আছে কি না? এবং যদি থাকে, সেই যোগসূত্র আইনসঙ্গত ও নথিভুক্ত কি না?
এই প্রশ্নের উত্তর BFIU-এর অনুসন্ধানেই পাওয়া যেতে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন নূরুল ইসলামকে ঘিরে
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনা যদি আর্থিক অনুসন্ধানের অংশ হয়, তাহলে নূরুল ইসলামের ব্যবসার আর্থিক ইতিহাসও একই ধরনের যাচাইয়ের দাবি রাখে—বিশেষ করে ফু-ওয়াং ক্লাবের বিরুদ্ধে অতীতের অভিযানগুলোর আলোকে।
যে প্রশ্নগুলো যাচাই করা জরুরি, সেগুলো হলো—নূরুল ইসলাম বা তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বর্তমানে কতগুলো বার বা ক্লাবের লাইসেন্স আছে; এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে কত পরিমাণ মদ-বিয়ার আমদানি বা সংগ্রহ করা হয়; কত শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়; অনুমোদিত মজুদের সঙ্গে বাস্তব মজুদের কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না; গুদাম থেকে বার পর্যন্ত পণ্যের চলাচলের পূর্ণ রেকর্ড আছে কি না; এবং এসব ব্যবসার ব্যাংকিং লেনদেন ও আয়কর বিবরণীর সঙ্গে বাস্তব ব্যবসার সামঞ্জস্য কতটা।
২০১৯ সালের ফু-ওয়াং অভিযানে মজুদের অসামঞ্জস্যের যে বিষয়টি র্যাব প্রকাশ্যে জানিয়েছিল, সেটিই এই অনুসন্ধানের একটি শক্ত ভিত্তি।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরেকটি প্রশ্ন—২০১৯ সালের ওই অভিযানের পর মামলার কী পরিণতি হয়েছিল? মামলায় চার্জশিট হয়েছিল কি না? আদালতে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে? জব্দ করা মদ-বিয়ার ও অন্যান্য সম্পদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? শেখ নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলার বর্তমান অবস্থাই বা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, ২০১৯ সালের অভিযানের পর আইনগতভাবে ঘটনাটির কী পরিণতি হয়েছিল।
‘২০ হাজার কোটি’ সম্পদের দাবি
নূরুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা—এটি অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি। কিন্তু এই অঙ্কের পক্ষে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথি না থাকায় এটিকে প্রতিবেদনটির তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
এখানে অনুসন্ধানের সঠিক পদ্ধতি হতে পারে কোম্পানি নিবন্ধন, জমির দলিল, শেয়ারহোল্ডিং, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানি নথি, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী একত্র করা। তারপর সম্পদের একটি আনুমানিক হিসাব তৈরি করা।
একইভাবে দিশা ইসলাম তাঁর বাবার সম্পত্তির অর্ধেক অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকা পাবেন—এমন দাবিও কোনো উইল, উত্তরাধিকার নথি বা সম্পত্তির সরকারি মূল্যায়ন ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আর এই উত্তরাধিকার ভবিষ্যতে সালমান মুক্তাদিরের নিয়ন্ত্রণে যাবে—এটিও একটি অনুমান, প্রমাণিত তথ্য নয়।
তাই অনুসন্ধানের মূল ফোকাস হওয়া উচিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, অর্থের নথি।
একটি পুরনো ক্লাব, একটি নতুন আর্থিক অনুসন্ধান
শেখ নূরুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাঁর ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযোগ একেবারে সাম্প্রতিক নয়। ২০০৯ সালের অনুসন্ধানী সংবাদে ফু-ওয়াং ক্লাবের মদ-বিয়ার ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৯ সালে র্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন মদ-বিয়ার উদ্ধারের কথা সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল। আবার একই সময় পুলিশি অভিযানে অবৈধ কিছু না পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৬ সালে নূরুল ইসলামের জামাতা হিসেবে পরিচিত সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য জরুরি ভিত্তিতে চেয়েছে BFIU।
এই তিনটি ঘটনাকে এক সুতোয় বেঁধে কোনো অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কিন্তু এগুলোকে আলাদা আলাদা নথি হিসেবে রেখে অনুসন্ধান করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত প্রশ্ন তৈরি হয়: ফু-ওয়াং এবং শেখ নূরুল ইসলামের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রকৃত আর্থিক কাঠামো কী?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি থেকে নয়, বের করতে হবে সরকারি লাইসেন্স, আমদানি নথি, গুদামের স্টক রেজিস্টার, শুল্ক-কর নথি, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির মালিকানা এবং আদালতের নথি থেকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগকে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা যাবে না। তাঁর BFIU-সংক্রান্ত অনুসন্ধান চলছে—এটুকুই প্রকাশ্য তথ্য। একইভাবে নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দল ও কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও স্বাধীন নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবে ফু-ওয়াং ক্লাবের বিরুদ্ধে অতীতে যে অভিযান হয়েছে এবং সেখানে অনুমোদনের অতিরিক্ত মদ-বিয়ার পাওয়ার যে সরকারি বক্তব্য নথিভুক্ত আছে, সেটি একটি বাস্তব ও যাচাইযোগ্য অনুসন্ধানের ভিত্তি।
এখন প্রয়োজন সেই পুরনো ফাইলগুলো আবার খোলা। ২০০৯ সালের অভিযোগের পর কী হয়েছিল, ২০১৯ সালের মামলার পর কী হয়েছিল, নূরুল ইসলামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কার মালিকানায় আছে, কী পরিমাণ মদ আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে, কত শুল্ক-কর দেওয়া হচ্ছে এবং বর্তমান আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে পুরনো ব্যবসার কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে অভিযোগের কতটা সত্য এবং কতটা কেবল প্রচার।
আর সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব নিয়ে BFIU-এর বর্তমান অনুসন্ধান সেই বৃহত্তর আর্থিক প্রশ্নের একটি পৃথক অধ্যায়। সংস্থাটি কেন তথ্য চেয়েছে, সেটি স্পষ্ট হলে এই অনুসন্ধান আরও নির্দিষ্ট পথে এগোতে পারে।