অভিনয়ের পর্দায় তাকে চেনেন দর্শক। উন্নয়নকর্মী হিসেবে তার আরেকটি দীর্ঘ পরিচয় রয়েছে। এবার সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো গবেষক ও শিক্ষকতার নতুন অধ্যায়। রাফিয়াত রশিদ মিথিলা পেশাজীবনের দুই দশকের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে পা রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগতে।
দীর্ঘদিন ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করার পর মিথিলা যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আর্ভিং ইনস্টিটিউট ফর ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল রিসার্চে সহযোগী গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন তিনি। একই সময়ে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে অ্যাডজাংক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবেও শিক্ষকতা শুরু করেছেন। অর্থাৎ পেশাজীবনের এই নতুন পর্বে অভিনয়ের পরিচয়ের চেয়ে গবেষণা, উন্নয়ন ও শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতাই তার কাজের কেন্দ্রে থাকছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মিথিলার কাজের পরিধিও বেশ বিস্তৃত। নিউইয়র্কভিত্তিক ‘আর্লি চাইল্ডহুড অ্যান্ড ফ্যামিলি হাব’ প্রকল্পের ডিজাইন ও মূল্যায়নে নেতৃত্ব দেবেন তিনি। প্রকল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ, পরিবার এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য।
শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর তার ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই প্রকল্পটি জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, সেবা ও সহায়ক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। মিথিলার দায়িত্ব শুধু একটি গবেষণা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন এবং গবেষণার উদ্দেশ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করাও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।![]()
দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা এখানেই তার বড় সম্পদ। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, মানুষের প্রয়োজন এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এবার গবেষণার জগতে কাজ করবেন। তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি এগোচ্ছে, সেখানে তার আগের অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।
মিথিলার পেশাজীবনের এই বাঁকটি তাই কেবল চাকরি পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি তার দীর্ঘদিনের উন্নয়নকর্মের অভিজ্ঞতাকে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করারও একটি পর্ব। এতদিন যে অভিজ্ঞতা তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অর্জন করেছেন, এবার সেটিকে গবেষণার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন।
কলম্বিয়ার পাশাপাশি শিক্ষকতাও তার নতুন পেশাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে ননপ্রফিট ম্যানেজমেন্ট পড়াবেন তিনি। শিক্ষার্থীদের শুধু শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে আটকে না রেখে বাস্তব জগতের ননপ্রফিট প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে, সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গেও পরিচিত করানোর সুযোগ থাকছে তার সামনে।
এখানেও মিথিলার আগের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। দুই দশক ধরে উন্নয়ন খাতে কাজ করার ফলে ননপ্রফিট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তার যে পরিচয় তৈরি হয়েছে, সেটিই এবার শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় নিয়ে আসতে পারবেন তিনি। ফলে শিক্ষকতার কাজটি তার জন্য কেবল একটি নতুন দায়িত্ব নয়; নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ারও একটি ক্ষেত্র।
ব্র্যাকের সঙ্গে মিথিলার সম্পর্ক এই নতুন অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিনোদন জগতের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার দুই দশকের অভিজ্ঞতার মধ্যে ১৫ বছর কেটেছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে কাজ করে। এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন বাস্তবতা ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি।
নতুন দায়িত্বের কথা জানাতে গিয়ে তাই পুরোনো কর্মস্থলের কথা আলাদাভাবে স্মরণ করেছেন মিথিলা। নিজের পেশাগত যাত্রার জন্য ব্র্যাকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। তার নতুন পরিচয়ের পেছনে যে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, তার বড় অংশই তৈরি হয়েছে সেই কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে।
মিথিলার পরিচয়ের সঙ্গে অভিনয় জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু তার পেশাগত পরিচয় কখনো কেবল পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। উন্নয়নকর্মী হিসেবে তার কাজের পরিসরও ছিল বিস্তৃত। এবার গবেষণা ও শিক্ষকতার মাধ্যমে সেই বহুমাত্রিক পরিচয়ের সঙ্গে আরও দুটি অধ্যায় যুক্ত হলো।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগকে মিথিলা দেখছেন নতুনভাবে শেখা ও কাজ করার সুযোগ হিসেবে। গবেষকদের সঙ্গে কাজ, উন্নত গবেষণা অবকাঠামো এবং প্রমাণভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে নিজের আগের অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার সামনে।
এই নতুন পর্বে ক্যামেরার উপস্থিতি হয়তো আগের তুলনায় কম থাকবে। কিন্তু কাজের পরিসর কমছে না; বরং বদলে যাচ্ছে তার ধরন। অভিনয়ের পরিচিত আলো থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ ও উন্নয়ন গবেষণার জগতে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান মিথিলা।
একজন অভিনয়শিল্পীর পরিচয়ের বাইরে যে দীর্ঘ পেশাগত যাত্রা তিনি তৈরি করেছেন, নতুন দায়িত্ব সেই যাত্রাকেই আরেক ধাপে নিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নকর্মী হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতা, গবেষক হিসেবে নতুন দায়িত্ব এবং শিক্ষকতার মাধ্যমে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে মিথিলার সামনে খুলেছে পেশাজীবনের ভিন্ন এক অধ্যায়।![]()