রাজু আলীম
স্মার্টফোন থেকে কম্পিউটার, গাড়ি থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডেটা সেন্টার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ব্যবস্থার নেপথ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ। বিশ্ব অর্থনীতিতে এই শিল্পের গুরুত্ব এখন এতটাই বেড়েছে যে চিপকে ঘিরে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ভূরাজনীতির সমীকরণও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সেই বিশাল শিল্পের কেন্দ্রস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ছোট। তবে দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করছে, শুধু ভোক্তা হিসেবে নয়, জটিল প্রযুক্তি ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবার অংশ হিসেবেও বাংলাদেশের জায়গা তৈরি হতে পারে। উল্কাসেমি তার অন্যতম উদাহরণ।
২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করা উল্কাসেমি এখন বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন খাতের পরিচিত নাম। প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৌশলী মোহাম্মাদ এনায়েতুর রহমানের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে ফিরে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটি দুই দশকেরও কম সময়ে একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। আজ উল্কাসেমির কার্যক্রমের বড় অংশজুড়ে রয়েছে চিপ ডিজাইন, ভিএলএসআই, ফিজিক্যাল ডিজাইন, অ্যানালগ ও ডিজিটাল সার্কিট এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশল সেবা। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের ৬০০-এর বেশি ডিজাইন প্রকৌশলী কাজ করছেন।
এনায়েতুর রহমানের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল দেশের শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেন। ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষার পর তিনি সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এএমডিতে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এএমডিতে তার ১২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওকি সেমিকন্ডাক্টর ও ভার্চুয়াল সিলিকনের মতো প্রতিষ্ঠানেও তিনি কাজ করেছেন।
সিলিকন ভ্যালিতে একটি স্থিতিশীল পেশাজীবন গড়ে উঠলেও এনায়েতুর রহমানের দৃষ্টিতে সম্ভাবনার আরেকটি জায়গা ছিল বাংলাদেশ। তার উপলব্ধি ছিল, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশের সব দরজা ফ্যাব্রিকেশন কারখানার মাধ্যমে খুলতে হবে এমন নয়। চিপ তৈরির আগে যে দীর্ঘ ও অত্যন্ত দক্ষতানির্ভর নকশা, যাচাই, ভৌত বিন্যাস এবং প্রকৌশল কাজ করতে হয়, সেখানেও বড় ধরনের মূল্য সংযোজন সম্ভব। বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও তরুণ মেধাবীদের সেই বৈশ্বিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করাই হয়ে ওঠে তার উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এই চিন্তা থেকেই গড়ে ওঠে উল্কাসেমি। শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র চার প্রকৌশলী নিয়ে। পরবর্তী সময়ে সেই ছোট দল ধীরে ধীরে বড় হয়েছে এবং দেশের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য ভিত্তি তৈরি করেছে।
উল্কাসেমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের একটি হলো আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারা। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে এটি তাইওয়ানভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ ফাউন্ড্রি টিএসএমসির ডিজাইন সেন্টার অ্যালায়েন্সের সদস্য। এমন সম্পৃক্ততা শুধু একটি বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিচয় নয়; উন্নত চিপ ডিজাইন ইকোসিস্টেমে কাজ করার সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
উল্কাসেমির কাজের পরিধিও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারা নেটওয়ার্কিং ও যোগাযোগ, সার্ভার ও স্টোরেজ, কম্পিউটিং, ইমেজিং, ইন্টারনেট অব থিংস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও প্রকৌশল সহায়তা দিয়ে থাকে। আইসি ফিজিক্যাল ডিজাইনের ক্ষেত্রে টিএসএমসি, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, স্যামসাংসহ বিভিন্ন ফাউন্ড্রির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সক্ষমতার কথাও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে ৫ ন্যানোমিটার পর্যন্ত প্রসেস প্রযুক্তিতে সফল টেপ-আউটের সক্ষমতার উল্লেখ রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উল্কাসেমির মতো প্রতিষ্ঠান চিপ ফ্যাব্রিকেশন কারখানা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে বসে তারা ৫ ন্যানোমিটার বা তার কাছাকাছি আকারের সিলিকন ওয়েফার উৎপাদন করছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাদের মূল সক্ষমতা হলো নকশা ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কাজ। একটি চিপের স্থাপত্য, সার্কিট নকশা, যাচাই, ভৌত বিন্যাস এবং ফ্যাব্রিকেশনের উপযোগী চূড়ান্ত ডেটা তৈরির মতো জটিল কাজ এখানে করা হয়। সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনের এই অংশও অত্যন্ত উচ্চমূল্যের এবং দক্ষতানির্ভর।
টেপ-আউটের সংখ্যাও একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশল অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। উল্কাসেমির বর্তমান ওয়েবসাইটে ৪০০-এর বেশি ফিজিক্যাল ডিজাইন টেপ-আউটের পাশাপাশি এসআরএএম ও ওটিপি টেপ-আউটের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উল্কাসেমির গল্প শুধু একটি কোম্পানির ব্যবসা বাড়ার গল্প নয়। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে মানবসম্পদ তৈরি। বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ইইই ও কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হলেও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরাসরি কাজ করার মতো দক্ষতা অর্জনের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ পাঠ্যক্রম এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে।
এই জায়গাতেই উল্কাসেমির উদ্যোগটি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি উল্কাসেমি ভিএলএসআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা ইউভিটিআই চালু করে। সেখানে আইসি লেআউট, আইসি ফিজিক্যাল ডিজাইন ও সার্কিট ডিজাইনের মতো বিষয়ে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিল্প-উপযোগী প্রকৌশলী তৈরি করা। এনায়েতুর রহমান জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে এক হাজার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার প্রকৌশলী তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
তার ভাবনায় শিক্ষা ও শিল্পের সংযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। সেমিকন্ডাক্টর এমন একটি খাত, যেখানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিয়ে প্রবেশ করা কঠিন। প্রয়োজন নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতা, ডিজাইন পদ্ধতির জ্ঞান, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, যাচাই এবং বাস্তব প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা। ফলে দেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কোম্পানিকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে।
এনায়েতুর রহমানের নিজের অভিজ্ঞতা তাকে এই বাস্তবতাটি আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে। বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর বাংলাদেশে ফিরে এসে একটি উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবসা দাঁড় করানো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং এটি ছিল প্রচলিত নিরাপদ ক্যারিয়ার পথ ছেড়ে তুলনামূলক অনিশ্চিত একটি খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত। তবে তার লক্ষ্য শুধু একটি কোম্পানি তৈরি করা ছিল না; দেশের প্রকৌশলীদের এমন একটি শিল্পে নিয়ে যাওয়া, যেখানে মেধার মূল্য অনেক বেশি এবং রপ্তানির সম্ভাবনাও বড়।
এই দর্শনের আরেকটি প্রকাশ পাওয়া যায় তার লেখা বইয়ে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব টেকনোলজি: সেমিকন্ডাক্টরস অ্যান্ড বাংলাদেশের পটেনশিয়াল’ বইটি বাংলায় সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ পাঠকের জন্য লেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে জটিল প্রযুক্তি বিষয়ে দেশের শিক্ষার্থী, তরুণ প্রকৌশলী ও সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ঘিরে এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আগ্রহ বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে খাতটির রপ্তানি আয় প্রায় ৮০ লাখ ডলার বলে সরকারি বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্য ও বর্তমান অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান অনেক বড়। সেই ব্যবধান পূরণ করতে শুধু একটি-দুটি সফল কোম্পানি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম।
এই ইকোসিস্টেম তৈরির অন্যতম শর্ত দক্ষ মানবসম্পদ। এনায়েতুর রহমানের মতে, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষায়িত তহবিল প্রয়োজন। তিনি অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি নিবেদিত তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখান থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও ছোট উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণা, এআই চিপ ডিজাইন, ভিএলএসআই ল্যাব এবং প্রকৌশলী প্রশিক্ষণেও এ ধরনের তহবিল কাজে লাগানো যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শিল্পের বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ এখনো বড় আকারের ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বা সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে যায়নি। ডিজাইন সেবা থেকে টেস্টিং, প্যাকেজিং ও অ্যাসেম্বলির মতো ধাপগুলো শক্তিশালী করা এখন বেশি বাস্তবসম্মত। খাতসংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক মানের এটিএমপি সুবিধা, গবেষণা অর্থায়ন, শেয়ারড ডিজাইন অবকাঠামো, সহজলভ্য ইডিএ টুলস এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতাকে পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করছে। প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্যকরণ, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উচ্চপ্রযুক্তির কাজ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতার কারণে নতুন ডিজাইন সেন্টার ও প্রকৌশল অংশীদারের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং বিপুল প্রকৌশলী তৈরির সক্ষমতা এই প্রতিযোগিতায় সুবিধা দিতে পারে। তবে এর জন্য শুধু সস্তা জনশক্তি নয়, দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন—যে জায়গায় উল্কাসেমির মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের বাস্তবতায় উল্কাসেমির আরেকটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে। এটি এখন কেবল একটি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন কোম্পানি নয়; দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের কাছে একটি সম্ভাব্য ক্যারিয়ার ক্ষেত্র এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা দলে সিলিকন ভ্যালির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত ও বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে বিস্তৃত।
মোহাম্মাদ এনায়েতুর রহমানের গল্প তাই একজন প্রকৌশলী থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার সাধারণ গল্প নয়। এর ভেতরে রয়েছে প্রযুক্তির সবচেয়ে জটিল শিল্পগুলোর একটিতে বাংলাদেশের প্রবেশের একটি পরীক্ষামূলক অধ্যায়। তিনি দেখিয়েছেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের ভূমিকা শুরুতেই কারখানা বানিয়ে চিপ উৎপাদন করা হতে হবে না। দক্ষ প্রকৌশলী, নকশা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানির মাধ্যমে প্রথমে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সম্ভব।
সেই পথ এখনো দীর্ঘ। ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়, আর বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে বাংলাদেশকে ভারত, ভিয়েতনামসহ অভিজ্ঞ দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। কিন্তু উল্কাসেমির প্রায় দুই দশকের পথচলা দেখিয়েছে, সঠিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ থাকলে বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশল সেবা দেওয়া সম্ভব। এনায়েতুর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো এখানেই—তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাননি, বরং বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতির সামনে এমন একটি দরজা খুলেছেন, যার ওপারে উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক শিল্পের বিশাল বাজার।
এখন সেই দরজা দিয়ে কতটা দূর এগোতে পারবে বাংলাদেশ, তা নির্ভর করবে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকৌশলী—সব পক্ষ কতটা সমন্বিতভাবে এগোতে পারে তার ওপর। উল্কাসেমি সেই যাত্রায় পথ দেখানো একটি প্রাথমিক মডেল; আর মোহাম্মাদ এনায়েতুর রহমান সেই মডেলের অন্যতম নির্মাতা।![]()